অন্ধকার থেকে হাসপাতালে

রাত প্রায় একটা বাজে। চারিদিকে খুব বৃষ্টি। বৃষ্টি আর কাঁদায় একাকার সারা গ্রাম। গ্রামের নাম নাগরগঞ্জ। এই গ্রামে এখনো কোন বিদ্যুৎ আসেনি। চারিদিকে অন্ধকার। অন্ধকার ঘরে হারিকেনের আলোতে শুয়ে ছটপট করে শিরীন।

শিরীনের বাচ্চা হবে। মরিয়ম খালা রাত এগারোটা থেকে চেষ্টা করে। কোন কিছুতেই কিছু হয়না। শিরীনের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। শিরীন ব্যাথার যন্ত্রণায় খুব কষ্ট পায়।

এদিকে মাটির বারান্দার চকির উপর বসে দোয়া দরুদ পড়ে আব্দুল আলীম। শিরীন আব্দুল আলীমের বড় ছেলে কবিরের বউ। কবির ঢাকায় চাকরী করে। আব্দুল আলীমের এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের শ্বশুর বাড়ি থাকে।

এদিকে কবিরের মা বেঁচে নাই। আব্দুল আলীম একা কি করবে বুঝে উঠতে পাড়ে না। কবিরকে একটা ফোন করা দরকার। কিন্তু মোবাইলে কোন টাকা নাই।

কবিরের এটাই প্রথম বাচ্চা। দুই বছর আগে শিরীনের সাথে কবিরের বিয়ে হয়। শিরীনের মা বাবা কেউ নাই। একটা বড় ভাই আছে তাও বিদেশ থাকে।

-আলীম মিয়া।

-কও মরিয়ম। কি অবস্থা?

-শুনো আলীম মিয়া। বৌমার অবস্থা খুব একটা ভালা না। আমার ডর করতাসে। তুমি বৌমারে সদরের হাসপাতালে নিয়ে যাও।

-কও কি মরিয়ম? চারিদিকে ঝড় বৃষ্টি। রাস্তা ঘাট কাঁদায় হাঁটা যায় না। হাসপাতাল পাঁচ মাইল পথ। এতো রাতে আমি আমি একা একা কি করুম? তুমি আর একটু চেষ্টা করো মরিয়ম। ভোর হইলে লইয়া যামু।

-আলীম মিয়া। আমার হাতে অনেক পোলা পান হইসে। কিন্তু বৌমার অবস্থা দেইখা আমি ডরাইতাছি। বাচ্চা পেটের মধ্যে উলটাইয়া আছে। তুমি রহিমের বাসায় যাও। রহিমের ভ্যানে কইরা অহনি হাসপাতাল লইয়া যাও।

আব্দুল আলীম হাতে ছাতা আর হারিকেন নিয়ে আধা ঘণ্টা হেঁটে রহিম মিয়ার বাসায় যায়। অনেক ডাকাডাকির পর রহিম মিয়ের বউ ময়না বের হয়।

-চাচা, জুলহাসের বাপ তো বাড়িত নাই।

-কৈ গেসে?

-যাত্রা দেখতে হরিপুর গেছে। ভোরে আইবো। কি হইসে চাচা।

-বৌমার অবস্থা ভালা না। হাসপাতাল নিতে হইবো। ভ্যানের চাবিটা দাও। আমি চালাইয়া লইয়া যাই।

-চাবিতো সাথে লইয়া গেসে। ভাবির কি হইসে চাচা? আমি আইতাসি। আপনে বাসায় জান।

এখন রাত দুইটা বাজে। এদিকে ঝড়টা আরও বাড়ে। আব্দুল আলীমের মাথায় কিছু ধরে না। সে ভ্যানের জন্য সগির মিয়ার বাসার দিকে যায়। সগির মিয়ার বাসা পাসের গ্রাম। এক ঘণ্টার পথ।

ঘুটঘুটে অন্ধকার আর কাঁদায় একাকার রাস্থা ঘাট। বাতাসে হারিকেনটা নিভে যায়। মেঘ চমকানির আলোতে আব্দুল আলীম হাঁটতে থাকে। মনের মধ্যে অজানা সঙ্কা।

শিরীন চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। মরিয়ম তাঁর মতো চেষ্টা করে যায়। এদিকে রহিম মিয়ার বউ ময়না আসে।

-ভাবি, কাইন্দ না ভাবি। আল্লারে ডাকো। মরিয়ম খালা তো চেষ্টা করতাসে।

-আমি মনে হয় বাচুম নারে ময়না। তোমার ভাইরে একটা খবর দিতে পারবা?

-অলুক্ষনে কথা কইওনা ভাবি। চাচার মোবাইলে টাকা নাই। আর আমাগো মোবাইল জুলাসের বাপ সাথে লইয়া গেছে। ভোর না হইলে কিছু করতে পারুম না ভাবি।

-আব্বায় কৈ?

-চাচা ভ্যানের জন্য ছুটা ছুটি করতাসে। মনে হয় সগির ভাইয়ের বাড়ির দিকে গেসে।

-মরিয়ম খালা, কিছু লাগলে কইয়ো।

-কিছু লাগবো না ময়না। তুমি একটু বারান্দায় আসো।

-ভাবি, তুমি একটু শান্ত হয়। আমি আইতাসি।

মরিয়ম খালা ময়নার সাথে কানে কানে কি যেন বলে। ময়না বৃষ্টির মধ্যেই খালি মাথায় ভিজতে ভিজতে বের হয়ে যায়।

ময়না বাসায় এসে তাঁর ছোট দেবর জামালকে ঘুম থেকে তুলে। হাতুড়ি আর দা দিয়ে তাঁরা ভ্যানের তালা ভাঙে।

মরিয়ম খালা আর ময়না মিলে শিরীনকে ভ্যানে তুলে শোয়ায়। একটা পলেথিনের নিচে শিরীনকে নিয়ে তাঁরা উঠে বসে। জামাল ভ্যান টানতে থাকে। এখন রাত তিনটা বাজে।

শিরীনকে দেখা মাত্রই জরুরী বিভাগের ডাক্তারা তাঁকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যায়। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে মরিয়ম, আর ময়না। জামাল ভ্যান নিয়ে আলীম মিয়ার খোঁজে বের হয়। অপারেশন থিয়েটারের ভিতর থেকে একজন ডাক্তার বের হয়ে আসেন।

-আপনারা রোগীর কে হন?

-প্রতিবেশী। আমি শিরীনের খালা লাগি।

-রুগীর স্বামী বা কাছের কেউ নাই?

-শিরীনের স্বামী ঢাকায় থাকে। শিরীনের শ্বশুর আছে। লোক পাঠাইসি। আইতাসে।

-শিরীনরে ক্যামন দেখলেন ডাক্তার আফা?

-দেখুন, হাতে সময় নাই। আপনারা অনেক দেরি করে ফেলেছেন। আমাদের একটা সিদ্ধান্ত দরকার। আমরা হয় রুগী না হয় বাচ্চা যে কোন এক জনকে বাঁচাতে পারবো। তাঁর পরো আমারা চেষ্টা করছি। বাকিটা আল্লার হাতে।

ডাক্তার অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে যায়। সাথে দুই জন নার্স। মরিয়ম খালা আর ময়না কি করবে কিছু বুঝতে পারেনা। তাঁরা আলীম চাচার জন্য অপেক্ষা করে।

জামাল ভ্যানে করে আলীম চাচাকে সাথে নিয়ে হাসপাতালে আসে ভোর পোণে পাঁচটায়। আলীম মিয়া ভিজে একাকার। ঝড়ে তাঁর ছাতা ভেঙ্গে যায়।

আব্দুল আলীম সব কিছু শুনে হাসপাতালের খালি বারান্দায় নামাজ পড়তে বসে। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া এই বিপদ থেকে তাঁকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।

বৃষ্টি টা এখন একটু কমে। ঘড়িতে ভোর সোয়া পাঁচটা। ডাক্তার আপা অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে আসে। আব্দুল আলীম ডাক্তার আপার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

-আপনি কি রুগীর শ্বশুর?

-জী আপা।

-আপনার একটা নাতনী হয়েছে। আল্লাহর রহমতে রোগী এবং বাচ্চা দুই জনই ভালো আছে।

আব্দুল আলীম হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে আজান দেয়। আব্দুল আলীমের আজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে চারিদিকের মসজিদ থেকে ফজরের আজান শুনতে পাওয়া যায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।