আকবর রহমানের চারিত্রিক সার্টিফিকেট

আকবর সাহেব মাস তিনেক হল রিটায়ার্ড করেছেন। তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারি চিফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। এতদিনের চাকরীতে কোন দিন তার কাজে কোন কালির দাগ লাগে নাই।

আকবর সাহেব অত্যন্ত সৎ আর ভালো একজন মানুষ। অসততার সঙ্গে আপোষহীন ছিলেন সবসময়।

তার জুনিয়ার অফিসার’রা এক একজন গাড়ী বাড়ী করে কোটি টাকার মালিক। আকবর সাহেবের কিছুই নাই। তাতেই তিনি অনেক খুশী। তিনি টাকার কাছে তার বিবেক বিক্রি করে দেন নাই।

আকবর সাহেবের দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। জামাই ইমপোর্ট এক্সপোর্ট এর বিজনেস করে।

মেজ মেয়েটার বিয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে। পাত্র আসে দেখে যায়। তাকে নিয়ে আকবর সাহেবের অনেক চিন্তা।

ছেলে স্কলারশিপ নিয়ে এখন কানাডায় থাকে। তাকে নিয়ে আকবর সাহেবের খুব একটা ভাবতে হয় না।

আকবর সাহেবের এখন ভাবনা চিন্তা পেনশনের টাকা নিয়ে।

তিনি পেনসনের জন্য কাগজ পত্র জোগাড় করেন। এক জায়গায় এসে ফ্রিজ হয়ে যায়। অনেক কাগজের মধ্যে এই কাগজটা নিয়েই যত ভাবনা চিন্তা।

কাগজটির নাম চারিত্রিক সার্টিফিকেট। চারিত্রিক সার্টিফিকেট আনতে হলে তাকে কমিশনারের কাছে যেতে হবে।

আকবর সাহেব কমিশনারের কাছে যেতে রাজী নন। কারণ কমিশনার নিজে্ই চরিত্রহীন!

খুন, ধর্ষণ, মানুষের জমি দখল, সরকারি জমি দখল, রিলিফের মাল আত্মসাৎ, থেকে শুরু করে হেন কোন খারাপ কাজ নাই যে তিনি করেননি।

এই রকম একজন লম্পট মানুষের কাছে থেকে আকবর সাহেবের চারিত্রিক সার্টিফিকেট আনতে হবে, এখনেই আকবর সাহেবের যত চিন্তা ভাবনা।

যার নিজের কোন চরিত্র নাই। এমন সব মানুষের কাছে থেকে কেন চারিত্রিক সার্টিফিকেট আনতে হয়, আকবর সাহেব ভেবে পান না।

যত তাড়াতাড়ি তিনি কাগজ পত্র জমা দিবেন, ততই ভালো। পেনশনের টাকা দিয়েই আকবর সাহেব মেজ মেয়ের বিয়ে দিবেন। এই নিয়ে নূপুরের মায়ের সাথে আকবর সাহেবের প্রতিদিন ঝগড়া হয়।

আকবর সাহেব মন খারাপ করে চুপচাপ বসে থাকেন। সুযোগ পেলেই নূপুরের মা কাঁটা ঘায়ে লবন ছিটা দেন। আর নূপুর? সব সময় ওর বাবার দিকেই টানে।

-দুনিয়ার পিচ্চি পিচ্চি পোলাপান, সরকারি চাকরী করে কতো কি করে ফেলে, গাড়ী, বাড়ী, জায়গা, সম্পত্তি, ব্যাংক ব্যাল্যান্স, কোন কিছুর অভাব নাই। আর উনি? এতোটা বছর ধরে চাকরী করেন, সারাটা জীবন নুন আনতে পান্তা ফুরায়।

-আম্মু, তুমি শুধু শুধু আব্বুকে বকো কেনো? আব্বু কি ঘুষ খাবে? না চুরি করবে?

-তুই চুপ কর? যেমন বাপ তেমন বেটি। সৎ মানুষ! এতো বেশি সৎগিরি ভালো না। ঘরে বাজার করার পয়সা নাই। ভালো মন্দ কোনদিন খেতে পরতে পারিনা, মেহমান জন আসলে বসতে দেয়ার জায়গা নাই, ঘরে একটা ভালো ফার্নিচার নাই। আর উনি সৎগিরি ফলাতে আসছেন। সারাটা জীবন তোর বাপ শুধু কষ্টই দিয়ে গেলো।

-শুনো নূপুরের মা। আল্লাহ্‌ আমাদের যে ভাবে রেখেছে, অনেক ভালো রেখেছে। আল্লাহর কাছে শোকর করো যে, তোমার স্বামী তোমাদের হারাম খাওয়ায় নাই।

-ঠিকই তো মা। আমার আব্বুর মতো কয়টা আব্বু আছে, বলো তো?

-তুই চুপ কর? আবার মুখে মুখে কথা বলিস?

-আহ। ওকে বকছো কেনো?

-আব্বু, এই দুপুর বেলা তুমি কৈ যাও?

-পার্কে গিয়ে বসে থাকি মা। ভালো লাগছে না।

-ভালো কথা তোর বাপের কোনদিন ভালো লেগেছে? যাও যাও, যেখানে মরতে যাচ্ছ, সেখান থেকে খেয়ে এসো।

আকবর সাহেব ঘর থেকে বেড়িয়ে যান। নূপুরের মা রান্না ঘরে ঢুকেন। আকবর সাহেব পার্কের বেঞ্চে বসে থাকেন। তার কিছুই ভালো লাগে না।

কতো চিন্তা ভাবনা আকবর সাহেবের মাথায়। চিন্তা করতে করতে বিকাল হয়ে যায়। এর মধ্যে ঘরে অশান্তি, বাইরে অশান্তি। আকবর সাহেবের শান্তি কোথায় নাই।

আব্বা, শুধু চারিত্রিক সার্টিফিকেট কেন? যে কোন ডকুমেন্টই আমি আনতে পারবো। আপনার কোথায় যাওয়া লাগবে না। শুধু ডকুমেন্টের নামটা দিবেন, ব্যাস। আকবর সাহেব চারিত্রিক সার্টিফিকেট টা হাত দিয়ে ছুঁয়েও দেখেননা।

-হ্যালো।

-আব্বু, তুমি কৈ?

-এইতো মা। পার্কে বসে আছি।

-ঘরে আসো। দুলাভাই এসেছেন। তোমাকে ডাকছেন।

-আসছি মা।

আকবর সাহেব বাসায় যান। তার খুব ক্ষুধা পেয়েছে। ঘরে মেয়ের জামাই। তাকে রেখে খেতেও পারছেন না।

-আব্বা ক্যামন আছেন?

-ভালো বাবা। তুমি ক্যামন আছো?

-জি আব্বা ভালো। আপনার মেয়ে বলছিলো, আপনার নাকি একটা চারিত্রিক সার্টিফিকেট লাগবে।

-হাঁ বাবা। কিন্তু…..

-আব্বা, এই যে আমি তুলে এনেছি।

-তুমি..?

-আব্বা, শুধু চারিত্রিক সার্টিফিকেট কেন? যে কোন ডকুমেন্টই আমি আনতে পারবো। আপনার কোথায় যাওয়া লাগবে না। শুধু ডকুমেন্টের নামটা দিবেন, ব্যাস।

আকবর সাহেব চারিত্রিক সার্টিফিকেট টা হাত দিয়ে ছুঁয়েও দেখেননা।

নূপুরের মা, কাগজ টা হাতে নিয়ে গজ গজ করতে করতে রান্না ঘরে যান। মেয়ের জামাইকে, জামাই আদর করেন। আকবর সাহেবের ভাত তাকে খাওয়ান।

আকবর সাহেব না খেয়ে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকেন। ঘরে আর ভাত নাই। নূপুর আকবর সাহেবের মাথায় হাত বোলাতে থাকে।

আকবর সাহেবের চোখ ভারী হয়ে উঠে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।