আগুনে পোড়া স্বপ্ন

বিল পেলে আমাকে কিন্তু একটা শাড়ি কিনে দিবা

ঢাকা শহরের একটি ঘিঞ্জি এলাকার নাম বংশাল। বংশালে একটি রোডের নাম মালিটোলা। মালিটোলায় একটা দোকানের নাম ”নূপুর হাউজ”। নূপুর হাউজে স্কিন প্রিন্ট এর যাবতীয় কাজ করা হয়। গার্মেন্টসের হ্যাংট্যাগ, লেদার প্যাঁচ, লেবেল, প্যাড, ভিজিটিং কার্ড, বিয়ের কার্ড, থেকে শুরু করে চাবির রিং পর্যন্ত কোন কিছুই বাদ যায় না। নূপুর হাউজের মালিকের নাম রাকিব হাসান। তিনি অনেক কষ্ট করে একটু একটু করে এই দোকান টা দাঁড় করিয়েছেন।

দোকানের পিছনেই হাসান সাহেবের বাসা। দোকানের পিছনের দরজার সাথে ঘরের দরজা লাগোয়া। তিনি স্ত্রী আর একটা বাচ্চা নিয়ে দুই রুমের এই বাসা আর দোকানটা ভাড়া নিয়ে থাকেন।

হাসান সাহেবের স্ত্রী’র নাম ময়না হাসান। হাসানের কাজের চাপ বেশী হলে, ময়না ঘরে বসে হাসান সাহেবকে কাজে সহযোগিতা করে।

ওদের সুখের সংসার। সুখের সংসারের একমাত্র সুখ তদের একটা মাত্র মেয়ে। মেয়ের নাম নূপুর।

নূপুর এখন ক্লাস ফোরে পড়ে। হাসান সাহেব নুপুরকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ান। নুপুরকে নিয়ে হাসানের অনেক বড় স্বপ্ন। তিনি নুপুরকে বড় ডাক্তার বানাবেন।

নূপুরের নাম দিয়েই হাসান সাহেবের দোকানের নাম। দোকানে আরও দুই জন কর্মচারী কাজ করে। আজ কয় দিন ধরে হাসান সাহেব খুবই ব্যস্ত। তিনি একটা গার্মেন্টসের অনেক বড় কিছু অর্ডার পেয়েছেন।

দশ লাখ পিস লেদার প্যাঁচ আর হ্যাংট্যাগের অর্ডার। হাসান সাহেব কাজের চাপে খাওয়া ঘুম সব ভুলে যান। এই কাজটা ঠিক মতো ডেলিভারি দিতে পারলে হাসান সাহেবের অনেক টাকা লাভ হবে। ক্যালকুলেটারের হিসাবে প্রায় পনেরো লাখ টাকা।

হাসান সাহেব এই টাকা দিয়ে গ্রামে বাবাকে জমি কিনে দিবেন। বাবা এখন পরের জমিতে বর্গা চাষ করেন। ভিটা বাড়ী ছাড়া গ্রামে তেমন কোন জায়গা জমি নাই। তিনি জমি জমার স্বপ্ন দেখেন।

-রাত একটা বাজে। তুমি সেই সন্ধ্যা বেলা কয়টা ডাল পুরী খেয়েছো। ভাত খেয়ে কাজ করো?

-এইতো হয়ে গেছে ময়না। সব প্যাকিং করা শেষ। কাল লাস্ট ডেলিভারি তো। হাতের কাজটা শেষ করেই ভাত খেতে আসছি। দোয়া করো ময়না।

-আল্লাহ্‌ ভরসা। আমি তো সব সময় দোয়া করি। অ্যাই, আল্লার রহমতে ঠিক মতো বিল পেলে আমাকে কিন্তু একটা শাড়ি কিনে দিবা।

-ধুর পাগলী, শুধু শাড়ি কেন? আমি মনে মনে ঠিক করছি, তোমাকে একটা হার বানিয়ে দিবো আর নুপুরকে একটা সুন্দর নূপুর বানিয়ে দিবো।

হাসান সাহেব সাত বছর আগে খালি হাতে ঢাকা শহরে আসেন। খেয়ে না খেয়ে তিনি ঢাকায় খুবই কষ্ট করেন। অনেক কষ্টে তিনি এই ব্যাবসাটা দাঁড়া করেন। এতো দিনে আল্লাহ মুখ তুলে তাকিয়েছে। সেই সুখে হাসান সাহেব মনে মনে মানত করেন।

হাসান সাহেবের ঘুমাতে ঘুমাতে রাত দুইটা বাজে।রাত প্রায় পৌণে চারটার দিকে। চারিদিকে চিৎকার, চেঁচামিচি আর প্রচণ্ড গরমে হাসান ময়নার ঘুম ভাংগে।

ঘুম ভেঙেই চোখ কপালে উঠে যায়। ঘরের কোনে টিনের চালের বেড়ায় আগুন জ্বলছে। সেই আগুন আলনায় লেগে সব কাপড় পুড়ে ছাই।

তাড়াহুড়ো করে ময়না নুপুরকে কোলে তুলে নেয়। হাসান সাহেব ময়নার হাত ধরে দরজা খুলেন।

চারিদিকে শুধু আগুন আর আগুন। বের হওয়ার কোন পথ নাই।

হাসান সাহেব টেবিলে থাকা এক জগ পানি দিয়ে নূপুর, ময়না আর নিজেকে কোন রকমে ভিজান। ময়না জোরে জোরে দোয়া দরুদ পড়তে থাকে আর কাঁদতে থাকে।

এই চার ফিট চিপা গলি পেরিয়ে ওদেরকে বড় রাস্থায় উঠতে হবে।

রাস্তায় যাওয়ার আর কোন পথ নাই। ময়নার হাত ধরে দরজা দিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথেই একটা জ্বলন্ত কাঠ সামনে এসে পড়ে।

তারা জ্বলন্ত কাঠ পেড়িয়ে কোন রকমে সামনে এগিয়ে যায়। গলির মুখে থাকা পুরানা কাঠ গুলি হটাৎ ধাউ ধাউ করে জ্বলে উঠে। আগুনের প্রচণ্ড তাপ, আর ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসে।

হাসান সাহেব শক্ত করে ময়নার হাত ধরেন, ময়না শক্ত করে নূপুরকে কোলে চেপে রাখে। আগুনের উপর দিয়েই জান বাঁচাতে হবে। হাসান সাহেব পথ ধরে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

হটাৎ কিছু একটার সাথে ময়নার শাড়ি আটকিয়ে যায়। ময়না শাড়ি ছুটানোর চেষ্টা করে। হাসান সাহেব ময়নার হাত ধরে টানতে থাকেন।

ময়না শাড়ি টেনে ছিঁড়ে ফেলে। ঘুরে উঠে এগুতেই সামনের জ্বলন্ত ঘরটা ভেঙ্গে পড়ে। হাসান সাহেবের আর কিছুই মনে নাই।

হাসান সাহেবের যখন জ্ঞান ফিরে, তখন নিজেকে আবিষ্কার করেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নয় নম্বার বেডে।

তার সারা শরীরে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা। শরীরের সিক্সটি পারসেন্ট এলাকা পুড়ে গেছে। তিনি বেডে শুয়ে ময়না-নূপুর, ময়না-নূপুর বলে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন।নার্স এসে আবার তাকে ঘুমের ইঞ্জেকশন পুশ করেন।

হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আগুনে পুড়া রুগীদের প্রচণ্ড যন্ত্রণা। তার সাথে নতুন যন্ত্রণা, চারিদিকে টিভি পেপারের সাংবাদিক আর পুলিশে ভরা। কারণ মন্ত্রী’রা আসবেন সস্থা সান্ত্বনার বানী শুনিয়ে নিজেদের ভোট ব্যাংক মজবুত করতে।

পরদিন দুই হাজার সতেরো সালের ২৪ জুলাই দেশের সব গুলি টিভি নিউজ আর জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় লাল কালিতে ছাপা হয়, ”বংশালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছয়জন জীবন্ত দগ্ধ”।

প্রতিটি পেপারে একই পরিবারের মা মেয়ের জীবন্ত দগ্ধ ছবি ছাপা হয়। হাসান সাহেব এখনো কিছুই জানেন না। রমনা থানার ওসি মাহবুব শরিফ জানান, কীভাবে আগুন লাগল এর রহস্য উদঘাটন করার জন্য তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।