‘আমার ব্যাথা বোঝার কেউ নাই’

মহান মুক্তিযুদ্ধে তার বাবা নিতাই চন্দ্র দাস যুদ্ধ করেছিলেন। তখন তার বয়স ছিল পনের। তিনি যুদ্ধাস্ত্র এগিয়ে দিয়ে মুক্তি বাহিনিকে সাহায্য করেছিল। এমনকি যুদ্ধের সময় তার পরিবার ভারতের নারায়ণ ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু আজ তাদের নাম মুক্তিযোদ্ধার কোটায় নেই।

সনাতন ধর্মীয় পুরাণ ও সাহিত্যে প্রেম-বিরহের অনুষঙ্গ হিসেবে আমরা বাঁশির ব্যবহার দেখতে পাই। কিন্তু সময়ের ক্রমবিকাশের ধারাবাহিকতায় এই বাঁশি জীবিকার ও ভালো লাগার মাধ্যমও হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুর ও সঙ্গীতপ্রিয় তেমনি এক মানুষ রাজশাহীর পুটিয়ার গনেশ। বয়স সত্তর ছুঁই ছুঁই। ছোটবেলা থেকেই বাঁশির প্রতি তার গভীর আকর্ষণ। ইচ্ছে ছিল বাঁশিতে তালিম নিয়ে নাম লেখাবেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, মন-মাতাবেন দর্শকদের। কিন্তু দারিদ্র্যতার চাপে গনেশের ভাগ্যে তা হয়ে ওঠেনি। নিতে পারেননি তেমন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। এর পরও তিনি বাঁশি ছাড়েননি। নিজের প্রচেষ্টায় শখের বাঁশি আয়ত্বে আনার চেষ্টা চলে নিরন্তর। অবশ্য এখন সুন্দর বাঁশিও বাজাতে পারেন তিনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবন ও জীবিকার তাগিদে বেছে নেন বাঁশি বিক্রির এ পেশা। ‘আমার ব্যাথা বোঝার কেউ নাই ,একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া।  আমি ৩০ বছর যাবৎ এ ক্যাম্পাসে বাশি বিক্রি করে অতি কষ্টে আমার সংসার চালাই , মাঝে মধ্যে একটা বাঁশিও  বিক্রি হয়না। রিক্ত হস্তে গাড়ি চালকদের  বকা সহ্য করেই বাড়ি ফিরতে হয় আমাকে। এমনটাই দু:খ প্রকাশ করে বলেন ক্যাম্পাসের অতি পরিচিত বাঁশিওয়ালা ও বিক্রেতা গণেশ।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী দিয়ে একটু এগিয়ে টুকিটাকি , রবীন্দ্র কলা ভবন ও চতুর্থ বিজ্ঞান ভবনের সঙ্গম স্থলে তিনটি গলির মধ্যখানে এই গণেশের দেখা মিলবে যে কারো সাথে। প্রতিদিন তিনি ঐ একই জায়গায় বাঁশি বিক্রি করে আজ সবার চিরচেনা মুখ গনেশ। বাঁশি বিক্রি করেই সংসার চলে তার। বাঁশি বিক্রির ফাঁকে ফাঁকে সুরেলা কন্ঠে বাঁশি বাজিয়ে শিক্ষার্থীদের  মাতিয়ে রাখেন তিনি। আর এভাবেই দিনকাটে এ বাশি বিক্রেতার। এছাড়া বাঁশি তৈরিতেও বেশ বাগপটু কারিগরী শিক্ষা আছে তার।  তিনি ৩০ বছর ধরে বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন প্রকারের বাঁশি তৈরি করে আসছেন। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বেলায় ইট-পাথরের ভারি বোঝা বহনে তিনি অক্ষম, এ বাঁশি দিয়ে তার সংসার ঠিক ভাবে চলেনা।
জানা যায় এর আগে তিনি তার বাঁশি বাজানোর নৈপূন্য দেখিয়ে রেডিও পদ্মা থেকে কয়েকটি পুরষ্কারও পেয়েছিলেন। এবং বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তার এ পারদর্শিতা প্রচারিত হয়। গনেশ আফসোস করে বলেন, সরকার যদি আমায় বাঁশি বাজানোর কাজে কোনো শিল্পীগোষ্ঠীর সাথে যুক্ত করার সুযোগ করে দিত, তাহলে আমার এ দু:খ অনেকটা মোচন হতো এবং আমার স্বপ্নও পূরণ হতো।
রাজশাহীর জেলার পুটিয়ার উত্তরে দাস মাড়িতে তার বাস। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমির ওপর নির্মিত একটি টিনের চালা ঘরে তার বসবাস। তিন ছেলের মধ্যে ইতোমধ্যেই দুই জন বিয়ে করে সংসারি হয়েছেন আর একজন এবার এসএসসি পরিক্ষার্থী। বড় ছেলে বিয়ে করে আলাদা হয়েছেন কয়েক মাস আগে।
স্কুল পড়ুয়া ছোট ছেলে,  স্ত্রীসহ পাঁচ সদস্যের এ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি গনেশ। পরিবারের সদস্যদের অন্ন জোগাতে তাকে বেছে নিতে হয়েছে বাঁশি বিক্রির এ ব্যবসা।
বাঁশি বিক্রেতার সাথে সাথে কথা বলে জানা গেছে, তার বাঁশির গ্রাহকদের প্রায় শতভাগই তরুণ শিক্ষার্থী। ছেলের মতো মেয়েদের বাঁশির প্রতি বেশ আগ্রহ রয়েছে। কেউ কেনেন শেখার জন্য, কেউ কেনেন স্বজনদের উপহার দিতে, আবার কেউ কেউ কেনেন শো-পিস হিসেবে। বাঁশির ধরন হিসেবে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। অনেকে দাম না করেই মূল্যের চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে যান। এতে তার যে টাকা আয় হয় তা খুবই সামান্য। এ সামান্য আয়ে তার সংসার চলে না। পয়সার অভাবেই বড় দুই ছেলেকে  এইচএসসি পাশ করাতে পারেননি।
এ সুরকার তার জীবন কাহিনী বলার শেষ প্রান্তে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে তার বাবা নিতাই চন্দ্র দাস যুদ্ধ করেছিলেন। তখন তার বয়স ছিল পনের। তিনি  যুদ্ধাস্ত্র এগিয়ে দিয়ে মুক্তি বাহিনিকে সাহায্য করেছিল। এমনকি যুদ্ধের সময় তার পরিবার ভারতের নারায়ণ ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু আজ তাদের নাম মুক্তিযোদ্ধার কোটায় নেই।

২৮/১১/১৭
আবু সাঈদ সজল

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।