ইতিহাস ঢেকে যায় পোস্টারে-ব্যানারে

তিলোত্তমা ঢাকা। ইতিহাস বলছে ঢাকা শহর কোলকাতার চেয়ে প্রাচীন। বয়স এখন ৪০০ বছরের অধিক। নদী আর খাল বেষ্টিত ঢাকা শহরে সেই সুপ্রাচীন কাল থেকেই রাজত্ব করেছে দেশী বিদেশী রাজশক্তি। সেসব রাজশক্তি নিয়ে গেছে অনেক কিছুই তবে শিল্পের নানান নিদর্শনও রেখে গেছে। গোটা ঢাকা শহর জুড়ে ছিল সেসব ঐতিহ্যের ছোঁয়া। ছিল জলরঙয়ে আঁকা ছবির মতো। তার প্রেমে সেই অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে এখানে ছুটে এসেছেন বহু শিল্পীও। কিন্তু আজ এই বিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা তার কিছুই অবশিষ্ট রাখিনি। না নদী, খাল, জলপথ, না পুরাকীর্তি। আধুনিক ঢাকা শহরের পথে পথে গড়ে উঠেছে দৃষ্টি নন্দন ম্যুরাল, স্থাপত্য ও সৌধ। তার থেকেই তিনটি স্থাপত্য নিয়ে আমাদের আজকের আলাপন। এই তিনটি স্থাপত্যের অবস্থাই আমাদের ধারণা দেবে গোটা শহরে স্থাপত্যগুলোর কি অবস্থা।

আসাদ গেট। যার পূর্ব নাম আইয়ুব গেট। ১৯৬৯ সালে ১১ দফা দাবী আদায়ের গণ আন্দেলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান আসাদ। আসাদের শহীদ হওয়া সেই সময়ের গণ আন্দোলনে আনে নতুন মাত্রা। তবে আসাদ আইয়ুব গেইটের কাছে শহীদ না হলেও সেই সময়কার আন্দোলনটি ছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে। সেজন্যই আসাদের স্মৃতি রক্ষার জন্য ঢাকাবাসী আইয়ুব গেটের নাম পরিবর্তন করে আসাদ গেট রাখেন। এই পরিবর্তনটি পাকিস্তান আমলেই হয়েছিল। ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের সাক্ষী হয়ে আসাদগেট দাঁড়িয়ে আছে মোহাম্মাদপুরের লালমাটিয়া ও ইকবাল রোডের মাঝ দিয়ে যাওয়া প্রধান সড়কের প্রান্তে। এদিকে রাজধানীর এলেনবাড়ি থেকে চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে আসতে পড়বে বিজয় স্মরণীর মুক্তিযুদ্ধ আর ভাষা আন্দোলনের অনবদ্য ম্যুরাল সমৃদ্ধ ফোয়ারা। আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস শিল্পীর চিত্রকলায় মার্বেল পাথরে তুলে ধরা হয়েছে এই স্থাপত্যে। কোন বিদেশী পর্যটকও গাইডের সহায়তা ছাড়াই এই ম্যুরাল দেখে বলে দিতে পারবে এটা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলছে চিত্রকলার মাধ্যমে। এবার আসি রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতি সৌধে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরো সময়টাতেই, পাকিস্তানী সৈন্যরা এবং তাদের স্থানীয় দোসররা শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, কবি ও লেখকদের ক্রমে হত্যা করে। ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনীর যৌথ দলের কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র দুই দিন আগে, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সর্বোচ্চ সংখ্যক হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতে অধ্যাপক, সাংবাদিক, ডাক্তার, শিল্পী, প্রকৌশলী, লেখকসহ পূর্ব পাকিস্তানের ২০০ জন বুদ্ধিজীবীদের ঢাকায় একএিত করা হয়েছিল। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, রাজারবাগ এবং শহরের বিভিন্ন স্থানের নির্যাতন সেলে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের রায়েরবাজার এবং মিরপুরের মধ্যে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। রায়ের বাজার বদ্ধভূমি সেই স্থানগুলোর একটি। বুড়িগঙ্গা অনেক আগেই হাউজিং ব্যবসায়ীদের দখলে চলে গিয়েছে। তবে বর্তমান সরকার এই সৌধ রক্ষার্থে বাউন্ডারি দেয়াল তুলে একটি কবরস্থান গড়ে তুলেছে যার দেয়ালের সাথেই রাখা হয়েছে সবুজ বনানী প্রতিষ্ঠার জায়গা। তবে সেই জায়গাও দখলে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বাস, ট্রাক এর পার্কিং। কোথাও বা আবর্জনার ভাগাড়। এছাড়া এই সৌধ প্রায় সব সময়ই ঢাকা থাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ব্যানারে। বোঝার উপায় নেই এটা স্মৃতি সৌধ নাকি কোন রাজনৈতিক সমাবেশের ময়দান।

আসাদ গেট, বিজয় স্মরণীর অবস্থা আরও শোচনীয়। পোস্টারে পোস্টারে ঢাকা গোটা স্তম্ভ ও ম্যুরাল। স্থাপত্যের কোন কিছুই আপনার চোখে পড়বেনা পোস্টার ছাড়া।

চারপাশে যেন ইতিহাস ও সংস্কৃতি নাশের এক মহামারী। নদী, খাল আর পুরাকীর্তি ধ্বংসের পর এবার বিংশ শতাব্দীতে গড়ে ওঠা ম্যুরাল, ভাস্কর্য ও সৌধের মাধ্যমে প্রস্ফুটিত ইতিহাস আর গোটা শহরের সৌন্দর্য আজ পোষ্টার ব্যানারে ঢাকা পড়েছে। তিলোত্তমা ঢাকা আর নেই। কিন্তু তার ইতিহাসও ঢেকে যাচ্ছে পোষ্টারে পোস্টারে। উত্তরের নগর পিতা নজর দেবেন কি?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।