এক পা’য়ের জীবন

১০ সেপ্টেম্বর দুপুর বেলা। বৃষ্টি হচ্ছে । তবু  মিরা তার স্বজনদের জন্য কিছু কেনার পর রাপা প্লাজা থেকে ফিরছে।শপিংকরার জন্য মিরা সব সময় দুপুর বেলাকেই বেছে নেয়। কারন এই সময় মার্কেটে লোক জন কম থাকে। নিরিবিলি থাকায় দেখে শুনে দাম দর করে কেনা যায়।

কেনা শেষে রিক্সা নিয়ে বাসায় ফিরছে মিরা। রিক্সা যাচ্ছে ধানমণ্ডির ৭ নাম্বার রোড দিয়ে। মিরার রিক্সার সামনের রিক্সায় দুইটা ছেলে মেয়ে অনেক ক্ষণ ধরে, একজন অন্যজনকে চুমু খেতে ব্যাস্ত। দেখেই মনে হয় দুই জনই স্কুল পড়ুয়া ছেলে মেয়ে। দুই জনই স্কুল ড্রেস পরে আছে।

মিরা সেখান থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, তাও পারে না, বার বার ঐ রিক্সার পিছনে চোখ আটকিয়ে যাচ্ছে। ওদের অবস্থা দেখে মিরার খুব শরম করে। অথচ শরম পাওয়ার কথা ছিল ওদের।

ওদের বাবা মা ওদের স্কুলে পাঠিয়ে খুবই নিশ্চিন্ত আছে। অথচ ওরা রিক্সায় করে প্রেমের স্কুল করে। মিরার রিক্সা টা খুব আসতে আসতে যায়, মিরার খুব রাগ হয়। আবার ব্যটা বজ্জাতের হাড্ডি, ঐ রিক্সার পিছন পিছন যায় অনেক ক্ষণ ধরে।

 

এমনিতেই মিরার তাড়া আছে, বাসায় গিয়ে ভাত খাবে, একটা হোম ওয়ার্ক করবে। সব সময় মিরার বেলায় দেখা যায়, যখন তাড়াতাড়ি দরকার, তখন রিক্সা খুব আসতে আসতে যায়, আর যখন রিক্সা নিয়ে ঘুরতে ইচ্ছা করে, তখন রিক্সা চলে একশো মাইল স্পীডে।

-এই রিক্সা একটু জোরে জোরে চালাতে পারছো না? ঐ রিক্সার পিছন পিছন যাচ্ছ কেন? এ দিকে রাস্তা নাই?

রিক্সা অয়ালা মিরার কথার কোন মূল্যই দেয় না। সে যেভাবে চালাচ্ছিলো ঠিক সে ভাবেই চালায়। মিরা যখনই রিক্সায় উঠে, তখনি রিক্সা অয়ালাকে ভাড়ার সাথে দুই পাঁচ টাকা বকশিস দেয়। এই রিক্সা ওয়ালার জন্য নির্ধারিত পাঁচ টাকা।

কিন্তু, ওকে বকশিস তো দুরের কথা, মিরা আরও পাঁচ টাকা কম দিবে। কারন, ব্যটা বজ্জাতের হাড্ডি। ঐ রিক্সার পিছনে যেন বাইস্কোপ দেখতে দেখতে যায়।

রাপা প্লাজা থেকে মিরার বাসায় আসতে লাগে খুব বেশি হলে পনেরো মিনিট। অথচ ব্যটা বজ্জাতের হাড্ডি পঁচিশ মিনিট লাগায়।

মিরার রিক্সা বাসার গেটে এসে থামে। রিক্সা থেকে নেমে ব্যাগ ঘেঁটে মিরা বিশ টাকার একটা নোট রিক্সা অয়ালাকে দেয়। রিক্সা অয়ালা মিরাকে পাঁচ টাকা ফেরত দেয়। মিরা টাকাটা নিয়ে ব্যাগে রাখার সময় দেখে, রিক্সা অয়ালার একটা পা হাঁটুর কাছে থেকে নাই।

-আফা, আমি জোরে রিক্সা চালাতে পারি না। আমার একটা পা নাই। মনে কষ্ট নিয়েন না আফা।

-না না, ঠিক আছে। কি করে হোল?

মিরা রিকশাওয়ালা বলার পর দেখে সত্যি তার এক পা নেই । মাত্র ডান পা দিয়ে রিকশা চলাচ্ছে ।

মিরার কথার উত্তর দেয় রিকশাওয়ালা -বছর পাঁচেক আগে রিক্সা চলানোর সময় পিছন থেকে একটা বাস মাইরা দেয়। বাসের নিচে আমার পা চলে যায়। কোন কাম জানিনা। কিছু কইরা তো খাইতে হইবো। তাই আবার রিক্সা ধরসি।

মিরার বুকের ভিতর অজানা কষ্ট হুহু করে উঠে। মিরা তাঁর ব্যাগ থেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে রিক্সা অয়ালার হাতে দেয়।

আফা। মনে কষ্ট নিয়েন না। আমি ভিক্ষা বা করুনা নেই না। আমার জন্য দোয়া কইরেন আফা। আসি।

রিক্সাওয়ালা টাকাটা মিরাকে ফেরত দিয়ে চলে যায়। মিরা বাসার গেটে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে চলে যাওয়া রিক্সার দিকে।

মিরার মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।