কোটা প্রথা, থেমে যাচ্ছে দরিদ্র মেধাবীদের শিক্ষাজীবন

পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হয়। শিক্ষার্থীরা  ভর্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেন বিভিন্ন ভাবে। কেউবা ভিড় জমান বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে। আবার কেউবা প্রাইভেট পড়ছেন ভাল ভাল শিক্ষকদের কাছে। সবমিলিয়ে বলা যায় নিজের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের সাবজেক্ট পাবে আবার কেউ জীবনের জন্য বইখাতা কে বিদায় জানাবে।

তবে এরমধ্যে একটা গোষ্ঠী আছে তার ব্যাতিক্রম । তাদের কোন কোচিং সেন্টার কিংবা প্রাইভেট পড়তে হচ্ছেনা। তারা পারিবারিক যোগ্যতায় তথা কোটায় ভর্তি হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন। এটি যেন প্রতি বছরের চিত্র । দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কোটা প্রথা বিদ্যমান আছে । যখন শিক্ষার্থীরা রাতের ঘুম হারাম করে পড়াশুনা করে চাঞ্চ পায়না তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মচারিদের সন্তানরা অনায়াসে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে মাত্র ৩২ নাম্বার পেয়ে। এতে শিক্ষার্থীরা মনে করছেন মেধার যথাযথ মূল্যয়ন দেওয়া হচ্ছে না। প্রকৃত দ্ররিদ্র মেধাবীর সন্তানেরা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এ প্রথার কারণে। কারণ যার বাবার অডেল টাকা আছে সে না হয় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়তে পারবে। কিন্তু যে দরিদ্র পরিবারের সন্তান, তারতো বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখাও পাপ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) পাঁচটি আলাদা কোটায় পৃথক হারে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় । কোটায় অন্তর্ভুক্ত শিক্ষার্থীদের পৃথক মেধাতালিকা করে তার ভিত্তিতে আসন বণ্টন করা হয়ে থাকে । এ ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৫ শতাংশ, ‘আদিবাসী’ কোটা ও ‘প্রতিবন্ধী’ কোটায় ১ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় । এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের ‘পোষ্য কোটায়’ভর্তি পরীক্ষায় পাস নম্বর পাওয়া প্রত্যেককেই ভর্তি করা হয় ।

এদিকে বুয়েটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে শুধু মাত্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী থেকে আসা শিক্ষার্থীরা কোটা সুবিধা পান । গত বছর এক হাজারের জন্য বরাদ্দ ছিল চারটি আসন । এর মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এবং নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের জন্য তিনটি এবং স্থাপত্য বিভাগের জন্য একটি আসন সংরক্ষিত আছে ।

বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) মোট ছয় ধরনের কোটায় ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হয় । তার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় প্রতি বিভাগে চারটি আসন রয়েছে । পোষ্য কোটায় কোনো সীমা নেই । এ ছাড়া খেলোয়াড় কোটা, সংস্কৃতি কোটা, প্রতিবন্ধী কোটার প্রতিটিতে ১০টি করে আসন রয়েছে । এ বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ব্যতিক্রমী একটি কোটা । আর তা হলো ভিসি কোটা । প্রতিবছর ভিসি তার নিজস্ব ক্ষমতাবলে ২০টি আসনে পছন্দের শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে পারেন ।

এ ব্যাপারে কথা বলেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আবু বকর সিদ্দিক এর সাথে তিনি বলেন, ‘আমরা যতটা পারি সচ্ছতার সাথেই এ কোটায় ভর্তি করে থাকি । ’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে চারটি কোটা । এগুলো হলো মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৫ শতাংশ, পোষ্য কোটা ৫ শতাংশ, আদিবাসী কোটা ২ শতাংশ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ২ শতাংশ কোটা ।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত শিক্ষাবর্ষ থেকে অনেকটা জোর করেই পোষ্য কোটা চালু করা হয়েছে । এনিয়ে শাবি তথা সিলেটজুড়ে ক্ষোভ দানা বেধে ওঠে । সবাইকে অগ্রাহ্য করে শাবিতে পোষ্য কোটা চালু রাখা হয়েছে । অথচ এ বিষয়ে কোন বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়নি । অচমকা অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পোষ্য কোটায় শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে।

গতবছর পোষ্য কোটায় শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে বলে রেজিস্ট্রার সূত্রে জানা গেছে । তবে কতজন ভর্তি হয়েছে তা তিন জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন ।

এ কোটার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে রমজান আলী শেখ নামের এক ভর্তিইচ্ছু শিক্ষার্থী বলেন, ভাই টেনশনে ঘুম আসেনা রাতে । এসএসসি ও এইচএসসি দুইটাতেই গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছি। কিন্তু প্রথম বার কোথাও চাঞ্চ হয়নি। অনেক জায়গায় সিরিয়াল এসেছিল কিন্তু সাবজেক্ট পায়নি । তাই খুব টেনশেনে আছি এবার কি হয় । রাতদিন কেবল পড়াশোনা করছি। অথচ কোটায় শিক্ষার্থীরা আমাদের চেয়ে বহু কম নাম্বার পেয়ে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। এর থেকে পরিত্রাণ হওয়া দরকার ।

আরেক শিক্ষার্থী তাসলিমা আক্তার জানান, সে গতবার তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়েটিং এ ছিল। কিন্তু একটাতেও ভর্তি হতে পারেনি। খুব কাছাকছি থেকে বাদ পড়ে গেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার স্বপ্ন তার থেমে গেছে।  বাবা-মা তাকে তারপর বিয়ে দিয়ে দেয়।

এ শিক্ষার্থী আরো জানান, তার বান্ধবি যে কিনা কোন রকম পাশ করে কোটায় ভর্তি হয়ে এখন একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। কারণ তার বাবা সে বিশ্ববিদ্যালয়েরে একজন কর্মকর্তা ।

আমজাদ হোসেন সরকারি কর্মকর্তা তার সন্তানও এবার ভর্তি পরিক্ষা দিয়ে কোথাও চাঞ্চ পায় নাই । তাই তিনি এ কোটা প্রথার বিরোধিতা করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় গুলো কোটায় কতজন ভর্তি করা হয়েছে তার সঠিক তালিকাও প্রকাশ করেন না । এটা নিয়ে অনেকটা লুকোচুরি করা হয়ে থাকে । মূলত দুর্বলতা ঢাকতেই এধরনের লুকোচুরির আশ্রয় নেয়া হয় । বিশেষ করে পোষ্য কোটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়ে থাকে । এ কোটা আনলিমিটেড । মানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ইচ্ছেমত বিভিন্ন সেশনে বিভিন্ন সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে থাকেন । এনিয়ে কোন সঠিক নীতিমালাও মানে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন । অথচ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে একটা সিটের জন্য শিক্ষার্থীরা কত কষ্টই না করেন । তারপরও সুযোগ না পেয়ে হতাশ হয়ে পরেন। এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন ,আমার ছেলেটা এখন পাগলের মত হয়ে গেছে । খাওয়া দাওয়া খবর নেই, সারাদিন শুধু পড়তেছে । জানিনা এবার কি হবে । তার বড় স্বপ্ন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।