কড়াইল বস্তিতে দাবা ক্লাব

 

মনিকা আর জিয়া দাবা খেলছেন। মনিকা শূন্য চাললেন। জিয়া চিন্তা মগ্ন। ভাবছে কি চালবে। সেও শূন্য চাললেন। মনিকা হাতি বাহির করলেন। জিয়া শূন্য দিয়ে সেই হাতিকে কাটলেন। তখন মনিকা মন বেজার করে বসে ভাবতে থাকলো। কী আর করার উপায় না পেয়ে সেও হাতি কাটলেন। জিয়া ঘোড়া দিয়ে ঘোড়া কাটলো আর মনিকা হাতি দিয়ে ঘোড়া কাটলেন। জিয়া উচ্চ কন্ঠে বলে উঠলেন ‘আমি তোর গুটি খামো’। বলেই সে মন্ত্রীটি কাটে। দুই জনই গুটি দিয়ে কাটাকাটির চিন্তা আছে। তাদের মধ্যে চলছে তুমুল খেলা। তাদের পাশের খেলছে রহিম বাদশা ও তানিয়া আক্তার ফারজানা। তারা সকলে কড়াইল বস্তির শিশু শিক্ষার্থী। তারা কড়াইল বস্তির ব্র্যাক স্কুলের পড়েন। গুলশান-বনানীর পাশে গড়ে উঠা কড়াইল বস্তিতে তাদেরকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবা ক্লাবটি।
জিয়া মোরশেদুল একজন শিক্ষার্থী। সে ব্র্যাক স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। সে গত ৩ মাস ধরে লেখা পড়ার পাশাপাশি দাবা খেলা শিখছে। প্রথম প্রথম সে খেলতে না চাইলেও অন্য যারা খেলছেন তাদের খেলা দেখতেন। জিয়া বলেন, ভাইয়া যেভাবে শিখায় তাই খেলতে মন চায়। আগে পারতাম না। এখন আমি গুটি কাটতে পারি। এখানে অনেক শিশু খেলে তাদেরকে দেখে আমার খেলতে ইচ্ছা জাগে। রহিম বাদশা। সে ব্র্যাক স্কুলে তৃতীয় শ্রেনীর একজন শিক্ষার্থী। সে বলেন, আমি অনেক মজা করে খেলে থাকি। গুটিগুলো খুব সুন্দর। হাতিটা কাটতে আমার ভালো লাগে। মন্ত্রী কাজ অনেক বেশি কিন্তু পাওয়াফুল। সে সবদিকে ঘুরতে পারে। মন্ত্রীই আমাকে জেতায়। তানিয়া আক্তার ফারজানা। সে ব্র্যাক স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। সে কড়াইল বস্তিতে মা-বাবার সাথে থাকে। আমরা প্রতিদিন পড়ালেখা শিখি। সময় হলেই স্কুলে আসি। সপ্তাহে একদিন দাবা খেলি। দাবা খেলার মধ্যে ঘোড়াটা আমার ভালো লাগে। ঘোড়া এলের মতো চলতে পারে।
ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অফ ল্যাংগুয়েজেস’র ইংরেজী বিভাগের শিক্ষক শামস উদ-দোয়া। তিনি যুবক বয়স থেকেই দাবা খেলতেন। তিনি জাতীয় পর্যায়ে দাবা খেলেছেন। ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অফ ল্যাংগুয়েজেস’র পরিচালক লেডি সৈয়দা সারওয়াত আবেদ জানতে পারেন সে ভালো দাবা খেলতে পারে। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবা খেলা শিখানো জন্য বলেন শামস উদ-দোয়াকে। তখন তিনি কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ব্র্যাকের সাভার ক্যাম্পাসে দাবা খেলা শিখাতে লাগলেন। কয়েক দিনের মধ্যে চার থেকে পাঁচজন ভালো ভাবে শিখলেন। তারপর তিনি মহাখালী ক্যাম্পাসে কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে ‘ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় দাবা ক্লাব’ চালু করেন। বর্তমানে এই ক্লাবে মোট ১শত জন সদস্য আছেন। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে তিনি গুলশান কড়াইল বস্তির ব্র্যাক স্কুলে ২০১৫ সালে তিনি দাবা ক্লাবের কার্যক্রম চালু করেন। সেখানে ব্র্যাক স্কুলের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দাবা শেখানোর ক্লাবের শাখা খোলেন। ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অফ ল্যাংগুয়েজেস’র ইংরেজী বিভাগের শিক্ষক ও দাবা ক্লাবের উপদেষ্টা শামস উদ-দোয়া বলেন,“দাবা মানুষের চিন্তাশক্তি ও মনোযোগ শক্তি বাড়ায়। আর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় দাবাকে শুধুমাত্র একটি খেলা হিসেবে শুরু করি নি। বরং আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা দাবাকে শিক্ষার একটি হাতিয়ার হিসেবে নিক। দাবার চর্চার মাধ্যমে তাদের পড়াশোনার উন্নতি সাধন করুক। দাবা খেলাটা শিশু বয়স থেকে শিখতে হয়। তাহলে অনেক ভালো করতে পারে। শিশু পর্যায় থেকে দাবাটা শেখানোর লক্ষ্যে কড়াইল বস্তির একটি ব্র্যাক স্কুলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দাবা শেখাতে কার্যক্রম চালু করি।” ২০১৫ সাল থেকে কড়াইল বস্তিতে ছয় থেকে আটজন শিশু নিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে প্রায় ৩৫ জন শিশু দাবা খেলা শিখছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় দাবা ক্লাবের মহাখালী শাখার সিনিয়র শিক্ষার্থীরা সেখানে শিশুদের দাবা শিখিয়ে থাকেন। কড়াইল বস্তির শিশুদের জন্য ৮জন সিনিয়র শিক্ষার্থী ঠিক করা হয়েছে। তারা হলেন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ’র শিক্ষার্থী শিয়াব শাহরিয়া, সাব্বির হোসেন, সোবায়েদ সাকিব, অথনীতির বিভাগের আদৃতা রহমান, সিএসই বিভাগের আহমেদ রাহিন, আরিফ শাকিল, নাজমুল হক লিমন ও ইলেক্ট্রিকেল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাইফ আহমেদ। তারা প্রতি সপ্তাহের বৃহঃস্পতিবার ২জন করে আসেন। এবংসকাল ১১টায় থেকে দুপুর ১টায় পর্যন্ত শিশুদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।
প্রশিক্ষক সাইফ আহমেদ বলেন, গত দুই মাস ধরে এখানে আমি শিশুদের দাবা শিখিয়ে থাকি।আমি এখনো দাবা খেলা শিখতেছি। আমরা এখানে আসার আগেই ঠিক করে আসি তাদেরকে কোন দিন কি শিখানো হবে। প্রথমে কয়েকটি ক্লাসের মাধ্যমে তাদেরকে দাবা শিখিয়ে থাকি। তাদেরকে শিখানোর জন্য সব নিয়ে ৭টি ক্লাস নিতে হয়। প্রথম ক্লাসে আমরা তাদেরকে দাবার গুটিগুলো পরিচয় করিয়ে থাকি। গুটি কিভাবে সাজানো হয় এবয় কোন গুটি কিভাবে কোথায় যেতে পারে তা শিখানো হয়। দ্বিতীয় ক্লাসে এসে প্রথমে প্রথম ক্লাসে যা শিখিয়ে ছিলাম তা পুনরায় করে থাকি। কোন গুটি কিভাবে কাটা হয় তা শিখানো হয়। তৃতীয় ক্লাসে আমারা প্রথম ও দ্বিতীয় ক্লাসের যা শিখছে তা পুনরায় করা হয়। রাজাসহ বিভিন্ন গুটিকে কীভাবে চেকমেট করা হয় এবং খেলা কীভাবে সমাপ্ত করা হয় তা শিখানো হয়ে থাকে। তিনি আরো বলেন, খেলার সহজ কৌশলগুলো শিখানো হয়। তারা অনেক ছোট সেই অনুযায়ী শিক্ষা দেয়া হয়। খেলার মূল উদ্দেশ্যটা শিখানো হয় তাদেরকে। গুটিকে কীভাবে রেসলিং করবে তাও শিখানো হয়। দাবা খেলার মধ্যে কঠিন কাজ হচ্ছে ঘর বদল করা যা তাদেরকে শিখানো হয়েছে।
অথনীতির বিভাগের আদৃৃতা রহমান বলেন, শিশুরা এখন দাবা খেলার অনেক কিছু পারে। গুটি সাজানো থেকে শুরু করে কোন গুটি কোন ঘরে চালবে এটা তা শিখেছে। তারা তাদের পছন্দের গুটি দিয়ে চালান দিয়ে থাকে। আর চালান দেয়ার আগে অনেক শিশু ভেবে চিন্তে গুটি চালায়। তাদেরকে যা শিখানো সহজে তারা তা শিখে নিচ্ছে। কিন্তু এখনো অনেক শিশু তেমন চিন্তা করে না। তারা কাটার দরকার শুধু কেটে যায়। সে কাটলে যে তার গুটিও কাটবে এটা চিন্তা করে না।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় দাবা ক্লাবের কার্যক্রম সর্ম্পকে জানতে চাওয়া হলে শামস উদ-দোয়া বলেন, আমরা প্রতি সেমিষ্টার শুরু ক্লাবের নতুন সদস্য নিয়ে থাকি। সদস্য নেয়ার আগে আমরা প্রথমে বাছাই করে থাকি। যারা ভালো খেলে তাদেরকে সদস্য হিসেবে নেয়া হয়। ক্লাবের সদস্যদের ভালো দক্ষ খেলোয়ার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রতি মঙ্গলবার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দাবাড়ু নিয়াজ মোরশেদ তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। তার কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পরামর্শ নিয়ে থাকে। আগামীতে জাতীয় প্রতিযোগিতা শিশুরা অংশগ্রহণ করতে পারে সেইভাবে তাদের গড়ে তুলা হচ্ছে। শিশু এখন খুব ভালো খেলতে পারে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।