গোরস্থানে কাটে যে জীবন

মোবারক আজিমপুর গোরস্থানে কবর খোঁড়ার কাজ করে। প্রতিদিন সে পাঁচ ছয়টা করে কবর খুঁড়ে। প্রতিটা কবররের জন্য সে পাঁচশো ত্রিশ টাকা করে পায়।

আজ এগারো বছর ধরে মোবারক এই কাজ করে। এই কাজ করতে করতে অনেকের সাথে মোবারকের ভালো জানাশোনা হয়ে গেছে।

জানাশোনার কবর আছে আরও প্রায় পঁচিশটা। পঁচিশটা কবরে ঘাস কাঁটা, গাছ লাগানো, পানি দেয়া, এই সব পরিচর্যার জন্য মোবারক, কবর প্রতি, মাসে আরো চারশো টাকা করে, মৃতদের আত্মীয়স্বজন থেকে পায়।

সেই অনুপাতে মোবারকের আয় ইনকাম অনেক ভালো। সে চার হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে তাঁর পরিবার সহ ঢাকায় থাকে। মোবারকের একটা মেয়ে। মেয়েটা ক্লাস সেভেনে পড়ে।

এগারো বছর আগে। মোবারকের চাচা তাঁকে এই কাজে ঢুকায়। চাচা আজ বেঁচে নাই। প্রথম প্রথম মোবারকের এই কাজ করতে ভয় লাগতো। এখন ভয় টয় কিছু লাগে না। রাত তিনটা চারটার সময় উঠে মোবারক বাঁধা ধরা কবরে পানি দেয়।

প্রতিদিন মোবারক এতো কবর খুঁড়ে, এতো লাশ দাফন করে, কতো মানুষের কান্না কাটি শুনে, এই সবে মোবারকের এখন আর কষ্ট হয় না। প্রথম প্রথম কষ্ট পেতো। এখন সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
এখন শুধু কষ্ট পায় বেওয়ারিশ লাশ দাফন করার সময়।

আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের গাড়ীতে করে প্রতিদিন আট দশটা বেওয়ারিশ লাশ আসে। বেশির ভাগ লাশ, পচা গলা দূরঘন্ধ বের হয়।

মোবারকের কাছে পৃথিবীর সব থেকে খারাপ গন্ধ, মানুষ পচা গন্ধ। এই গন্ধ সহ্য করার মতো না।
এই সব পচা গলা লাশের কোন যত্ন মোবারক নিতে পারে না। যত্ন নেয়া সম্ভবও না। নাকে কাপড় বেঁধে কোন রকমে দুই তিনটা লাশ এক কবরে মাটি চাপা দেয় মোবারক।

কোন লাশেরই চেহারা মোবারক দেখতে পায়না। দেখাও সম্ভব না। অনেক সময় এদের জানাজাও পড়া হয়না। দূরে দাঁড়িয়ে গোরস্থানের হুজুর ইচ্ছা হলে কিছু পড়ে, না হলে নাই।

আজ কয়দিন ধরে মোবারক গোরস্থানে আসে না। মোবারকের অনেক বিপদ। মোবারকের মেয়েকে কোথায় খুঁজে পাওয়া যায় না। মেয়ে হারিয়ে গেছে আরও মাস খানিক আগে।

থানা, পুলিশ, হাসপাতাল, পত্রিকা অফিস থেকে শুরু করে খোঁজার কোন জায়গা বাকি থাকে না। মোবারক পাগল হয়ে যায়।

পুলিশ কয়দিন আগে বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে ভাসমান অবস্থায় একটা মেয়ের পচা গলা লাশ পায়। পুলিশ মোবারককে খবর দেয়। মোবারক, তাঁর বাবা, পরিবার, আত্মীয় স্বজন, আর এলাকার দুই একজন বড় ভাই সহ থানায় যায়। পুলিশ ফাইল বের করে।

মোবারক লাশের ছবি দেখে চিনে ফেলে। লাশের গায়ে মেয়ের জামা। মোবারক থানায় চিৎকার করে উঠে। মেয়ের মা জ্ঞান হারায়। পুলিশ এলাকার বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলে।

লাশ টা আমরা প্রায় বিশ দিন আগে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে উদ্ধার করি। আমরা ঢাকা মেডিক্যালে পোস্টমর্টেম জন্য পাঠাই। তারপর লাশ টা মর্গে পড়ে থেকে আরও চার পাঁচ দিন। সারা দেশের সব থানায় আমার ম্যাসেজ দেই। লাশের কোন পরিচয় পাইনা।

কি করে মারা গেলো, কে মারল? তা কি আপনারা বের করতে পেরেছেন?

আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে আমরা জানতে পারি, তাঁকে গন ধর্ষণ করে, গলা টিপে মেরে ফেলে লাশ নদীতে ফেলে দেয়।

কিন্তু, এর আগেও তো মোবারক আপনাদের কাছে এসেছে। তখন কেন জানাননি?

ডিউটি অফিসার ছুটিতে ছিলো। আমারা জানতাম না। মেয়েটা কোথায় থেকে হারায়?

মেয়েটা লালবাগ বাজার থেকে হারায়। মেয়েটা বাজারে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। সেদিন ছিল খুব বৃষ্টি। আর সন্ধ্যা বেলা।

লাশটা কি এখনো মর্গে আছে?

না, আমরা ছয় দিন আগে লাশটা বেওয়ারিশ লাশ হিসাবে আঞ্জুমান মফিদুল কে হ্যান্ডওভার করি। আপনারা আঞ্জুমান মফিদুলে খোঁজ নেন।

আঞ্জুমান মফিদুল থেকে জানা যায়, লাশের নাম্বার পাঁচশো সাতাইশ, পাঁচশো সাতাইশ নম্বার লাশ, তেরো তারিখে আজিমপুর গোরস্থানে দাফনের জন্য পাঠানো হয়।

তেরো তারিখে মোট পাঁচটা বেওয়ারিশ লাশ আসে। সবগুলি লাশ মোবারক নিজে দাফন করে।

এরপর মোবারক, পাঁচশো সাতাইশ নম্বার লাশের জন্য কবর খুঁড়ে। সাথে পুলিশ, আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের লোকজন, মোবারকের পরিবার, আত্মীয় স্বজন, এলাকার মানুষ জন সবাই দাঁড়িয়ে।

এরপর থেকে মোবারক পাগল হয়ে যায়। সে আর কোন দিনই কবর খুঁড়ে না। সারাদিন খেয়ে না খেয়ে, গোরস্থানে মেয়ের কবরের পাসে বসে থাকে।

এক এক করে কেটে যায় তিনটা বছর। যখন কোন বেওয়ারিশ লাশ আসে। মোবারক ছুটে যায় লাশের কাছে। মোবারক পাগলের মতো চিৎকার করতে থাকে।

মোবারকের চিৎকারে ভারী হয়ে উঠে সারা আজিমপুর গোরস্থান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।