জল জমিনের বারুগ্রাম ও ইসমাইল মোল্লার ব্যাথার বীণা

রাজবাড়ী থেকে মোটর সাইকেলে বহরপুর। বালিয়াকান্দি উপজেলার ইউনিয়ন এই বহরপুর।পৌছাতে সময় লাগে ৪০ মিনিট । বহরপুর বাজারে একটু থেমে বারুগ্রামের পথে যাত্রা শুরু। চলতে চলতে ঘনবসতি ক্রমে কমতে শুরু করে। এক সময় হারিয়ে যায় সব। বাড়িঘর, মানুষ। থাকে কেবল প্রকৃতি, নিরবিচ্ছিন্ন সবুজ, নীরবতা আর বাতাসের শনশন শব্দ। রাস্তা ভাল। গাড়িও ছুটছে দ্রুত। চারিদিকে শুধু মাঠ আর ফসলের ক্ষেত। মাঝ খান দিয়ে রাস্তা। আর কতদূর বারুগ্রাম?
বারুগ্রামের পথে

 

 

 

 

 

 

দৃষ্টিসীমায় চলে আসে বর্ষা পানিতে যৌবন ফিরে পাওয়া বিল। জেলেদের নৌকা, ভেসাল আর মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে ব্যাস্ত  কিছু মানুষ। হোন্ডা থামে।

প্রশ্ন ছোটে কিছু মানেুষের কাছে, বরুগ্রাম কত দূর?

জবাব, এইতো সামনে।

আবার চলার শুরু। এবার  ইট বিছানো রাস্তা। কয়েক কিলোমিটার চলার পর দেখা মেলে বরুগ্রামের। বর্ষার পানিতে বন্দী কয়েক ঘর মানুষের ছোট একটি গ্রাম। বসত বাড়িগুলো উচু স্থানে হওয়ায় বর্ষার পানি উঠার সম্ভবনা নেই। কিন্তু পানিতে থই থই ফসলের ক্ষেত।

এখানে প্রায় সকল মানুষের পেশা কৃষি। বর্ষায় কৃষিকাজ না থাকায় মাছ ধরাটা প্রধান পেশা হয়ে যায়। রাস্তার পাশে মটর সাইকেল রেখে স্থানীয় একজনের সাথে কথার শুরু। কথার মাঝে আরো একজনের সম্পৃক্তি ঘটে। নাম ইসমাইল মোল্লা। বয়স ৩২/৩৩ বছর হবে। কিছুক্ষণ পরে যাবেন নৌকা নিয়ে বিলে মাছ ধরতে। বরুগ্রামে আগন্তুক আমাদের আগ্রহ বাড়ে তার সাথে যাওয়ার। তিনিও আমাদেরকে নৌকায় তুলে নেন। জলে ভাসতে ভাসতে জীবন জলের গভীরে সাতার শুরু হয়। বাজতে শুরু করে কথায় ব্যাথার বীণা।

বারুগ্রামের ইসমাইল মোল্লা

ইসমাইল মোল্লা এ গ্রামে বসবাস করেন অনেক বছর। এখানে যারা বসবাস করেন এদের বেশির ভাগ মনুষ দরিদ্র। সচ্ছল পরিবার খুব একটা নেই। পেশা মূলত কৃষি কাজ। তবে বর্ষার সময় মাছ ধরেন । বিলে এখন বড় মাছ পাওয়া যায় না। দুই একটা যা পাওয়া গেলেও তা আসে ভেসালে (এক ধরণের জাল)। তার নাবানীতে (বাশের তৈরী ছোট মাছ ধরার খাঁচা) সব ছোট মাছ ধরা পরে। যেমন, সর পুটি, ছোট কই, টাকি, বেলে, আর নাম না জানা কিছু মাছ। ইসমাইল  প্রতিদিন প্রায় ২০০টাকার মাছ বিক্রি করেন।

জমিজমা বলতে দেড় পাখি কৃষিজমি নিজের। এতটুকু জমি নিজে চাষ করেন আর অন্যের জমিতে দিন চুক্তিতে কাজ করেন। এ দিয়েই চলে তার জল জমিনের সংসার। জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেননা কেন জানতে চাইলে সহজ ভঙ্গিতে তার উত্তর, এতে লচ হয়। সাথে একটা ছোট্ট হিসাব দিয়ে দিলেন, চাষ খরচ, সার খরচ আর কায়িক শ্রমের। তার ভাষ্য, এর চেয়ে অন্যখানে গতর খাটানো অনেক ভাল। দিন শেষে ৪০০ টাকা নগদ পাওয়া যায়।

এখানকার জমির দাম খুব কম। ২ থেকে ৩ লাখ টাকায় রাস্তার পাশের সেরা এক পাখি(৩০ শতাংশ) জমি কেনা যায়। ভেতরে আরো কম। তারপরও জমির বেচাকেনা নাই। বেচাকেনা কম হওয়ার করণ জানতে চাইলে বলেন, মানুষের হাতে টাকা নাই। জমি কিনবে কিভাবে? শুধু যারা বিদেশ থাকে তারাই জমি কিনতে পারছে।

‘এবার মাঠে ফসল কেমন হয়েছে?’ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখনতো পাটের সময়। পাট এবার কারোই ভাল হয় নাই। শুরুতেই বৃষ্টিতে পাট নষ্ট হয়ে গেছে। তার উপর যে খরচ হয় ফসল করতে সে দামে বিক্রি হয় না।কৃষকরা এবারো লাভের মুখ দেখবে না। ফসলে এখন লাভ হয় না। জমি পতিত ফালই রাখা লাগে তাই চাষ করতে হয় ।’

তার মতে, কৃষকদের এখন খুব খারাপ অবস্থা চলছে, কোন উপায় নাই। মিল কারখানাও নাই যে তারা সেখানে কাজ নেবে।

‘কেমন কাটলো ঈদ?’ তার সোজা উত্তর, ‘ঈদের দিন নামজ পড়ছি। ছেলের নতুন জামা দিছি। ভাল কাটছে।’

‘নিজে কিছু নেন নাই ঈদে?’

‘আমাগো ঈদ আছে নাকি। ঈদ হলো ছোটদের জন্য।’

‘দেশ কেমন চলছে?’ প্রশ্নের উত্তরে কিছু একটা বলব বলব বলেও বলেননা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, ভালই। ক্ষমতা যেদিক সব সেইদিক।

আর কথা বাড়েনা। বিদায় নিতে হয় জল জমিনের সংসার থেকে। পুরনো পথে প্রকৃতি দেখতে দেখতে রাজবাড়ির পথে ফেরার যাত্রা শুরু। কিন্তু মনে গেঁথে থাকে বারুগ্রাম। একজন ইসমাইল মোল্লার কথায় থাকা ব্যাথার বীণা বাজতে থাকে মনে।

প্রকৃতিকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠা যাপিত জীবনের ইসমাইল মোল্লার তথাকথিত বড় স্বপ্ন নেই। আছে কিছু প্রশ্ন আর ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার ব্যাথা। শ্রমের সঠিক মূল্যটা পেলে হয়তো আর কোন চাওয়াই থাকতো না ওদের।

সা স/ হা আ