জাহাঙ্গীরের জীবনে “সাপলুডো”

জাহাঙ্গীর বাস চালিয়ে দৈনিক ১১ হাজার টাকা আয় করে। যার মধ্যে গড়ে ৮০০-১০০০ টাকা চাঁদা বাবাদ এবং মালিকদের প্রাপ্য অংশ, বাস কন্ট্রাক্টর, হেলপারদের বেতন ও তেলখরচ বাদ দিলে মাসে তার আয় দাঁড়ায় ১৫ হাজার টাকা। অর্থ্যাৎ দৈনিক ৫ শত টাকা।

দিনটি ছিল ৪ই জুন, শনিবার। সূর্যটা কিছুটা পশ্চিমে হেলে পড়েছে। কিন্তু প্রচন্ড রৌদ্রতাপ তখনও বিরাজমান। ডেইরী গেটের পাশের যাত্রী ছাউনিতে বসে দুপুরের তাপদাহে ক্লান্ত এক দিনমজুর। পেশায় বাসচালক। চোখ জুড়ে তার ক্লান্তি আর অবসাদ। হাতে বেনসনের প্যাকেট। তার পরনে ছিল ধূলিময় আর ঘামে সিক্ত গেঞ্জি ও লুঙ্গি। সারাদিন অসহনীয় গরমে বাস চালিয়ে যেন একটু বিশ্রামের আশায় নিয়েছিল এই যাত্রী ছাউনিতে। নাম তার জাহাঙ্গীর উদ্দিন।

জাহাঙ্গীরের আবাসস্থল গাজীপুর। প্রতিদিন সে কালিয়াকৈর হতে গাবতলী বাস চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। এরই মাঝে ঘটে যায় কত ঘটনা। সেসবের বর্ণনা একের পর এক শুনলাম তার মুখে।

দিনে ২ থেকে ৩ ট্রিপ (আপ-ডাউনসহ) দেয় জাহাঙ্গীর। সকালে কালিয়াকৈর বা গাবতলী যেখান থেকেই বাস ছাড়ুক না কেন দিনের শুরুতেই তাকে ৩২০ টাকা ষ্টেশন ভাড়ার নামে চাঁদা দিতে হয়। তারপর শুরু হয় তার যাত্রা। মাঝে নবীনগর, সাভার শেষে গাবতলীতে ২১০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। এখানেই শেষ নয়। সার্জেন্টদের নানা সময়ে চাঁদা দিয়ে তাদের খুশি রাখতে হয়। তা না হলে যেকোন অজুহাতে হয়তো বা বাসটি থানার সামনে চলে যেতে পারে। তখন আরও বড় অংকের চাঁদার/ঘুষের সম্মুখীন হতে পারে।

জাহাঙ্গীর বাস চালিয়ে দৈনিক ১১ হাজার টাকা আয় করে। যার মধ্যে গড়ে ৮০০-১০০০ টাকা চাঁদা বাবাদ এবং মালিকদের প্রাপ্য অংশ, বাস কন্ট্রাক্টর, হেলপারদের বেতন ও তেলখরচ বাদ দিলে মাসে তার আয় দাঁড়ায় ১৫ হাজার টাকা। অর্থ্যাৎ দৈনিক ৫ শত টাকা। এছাড়াও  ঈদ, পূজা পার্বনে গাড়ি রিজার্ভ চালিয়ে কিছু বাড়তি রোজগার করে থাকে। মালিকরা যা বোনাস দেয় তাই নিয়েই তার খুশি থাকতে হয়। বাস দুর্ঘটানার জন্য তিনি তিনটি কারণকে প্রধান বলে মনে করেন। প্রথমত বাস চালানোর সময় কে কার আগে যাবে সেই প্রতিযোগিতা করা। দ্বিতীয়ত অনেক সময় সারারাত জেগে তাদের বাস চালাতে হয়। দিনে দেড়/দুই ঘন্টা সময় বিরতি পেলে সে সময়ে খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় হয় না। ফলে ঘুম চোখেই পুনরায় বাস চালাতে হয়। তৃতীয়ত পারিবারিক কলহ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, আর মানসিক অশান্তির কারণে বাস চালানোর সময় তার মন নিজের অজান্তেই তার পরিবারের কথা ভাবতে থাকে। অমনোযোগিতাও এর অন্যতম প্রধান কারণ।

বর্তমানে জাহাঙ্গীর এক মেয়ে ও দুই ছেলের জনক। সন্তানদের নিয়ে তার বুকভরা স্বপ্ন। তিন সন্তানকেই সে লেখা-পড়া করায়। জাহাঙ্গীর একরকম পরিবারের অবাধ্য হয়েই পনের বছর বয়সে সে এ পেশায় এসেছিল। তিন বছরের মাথায় সে বাসচালক হয়। তার ভাই-বোন আজ অনেক ভাল অবস্থানে থাকলেও তার একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আজ সে এ পেশায় দিনরাত শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। তারপরেও সে তার এ অবস্থানের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করে মনকে স্বান্তনা দেয়। তার স্বপ্ন ছেলে-মেয়েদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার করবে। তাতে যদি তার শরীরের কিডনি বিক্রি করতে হয় তার সে করতে প্রস্তুত। এ স্বপ্নই তাকে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়। এ আশার আলোয় বুক বেঁধেই জাহাঙ্গীর কাটিয়ে দিতে চায় তার বাকী জীবন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।