জীবন চলে বেড়ানোও চলে

সর্বসাধারণ

 

মেসের আলীর বয়স ছয় ভাইবোনের মধ্যে বড়। দায়িত্ব তাই অনেক । রাজধানীতে ডাব বিক্রি করে আসছেন প্রায় তিরিশ বছর থেকে । তার আদি বাড়ি জয়পুরহাটের মাহমুদপুর ইউনিয়নের ধুনতলা গ্রামে ।

মেসের আলী বলেন , জীবিকার তাগিদে ঢাকায় আসার পরই তিনি ডাব বিক্রি শুরু করেন ।প্রথমদিকে প্রতিটি ডাব বিক্রি হত চার আনা থেকে আট আনায়। সেই ডাব এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় ।

ডাব বিক্রিই কেন করেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন , চাকরি পামু কই ? এর চে ডাব বিক্রি করে মাসে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা লাভ হয় । এতেই সংসার চলে যায় । যখন ইচ্ছা তখন গ্রামের বাড়ি যাই । চাকরি করলে কি সেই সুয়োগ পেতাম ।

শীতকালে মেসের আলী সারাদেশ ঘুরে বেড়ান । ঘুরতে তার ভাল লাগে । দেশের এমন কোন বিখ্যাত জায়গা নেই যেখানে তিনি ঘোরেননি ।

মেসের আলী বলেন , ঘুরতে চাইলেই ঘোরা যায় । টাকা কোন ব্যাপার না । লোকাল ট্রেনে একবার সিলেট গেলেন । ওখানে শাহজালাল , শাহপরাণের মাজার জিয়ারত করলেন ।জাফলং, বিছানাকান্দি , রাতারকুল সব দেখলেন । সিলেটে ছিলেন মাস খানেক ।

 

মেসের আলী বলেন , ” সিলেটে  কিন ব্রীজ নামের একটা ব্রীজ আছে । ওই ব্রীজে রিকশা ওঠার সময় পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে রিকশাওয়ালাকে সাহায্য করতে হয় ।”

তিনি সেই কাজ করতেন সিলেটে থাকাকালে ।

সিলেট থেকে লোকাল ট্রেনে চলে যান চট্রগ্রামে ।সেখানে পাহাড়তলীর জাকির হোসেন রোডের একটা রিকশা গ্যারেজে গিয়ে দেখেন তার ধুনতলা গ্রামের আব্বাসকে । সেই আব্বাসের জিম্মায় একটা ভাড়া করা রিকশা নিয়ে চালাতেন ।এভাবেই পুরো শহর দেখা ও আয় করা ।

সেখান থেকে চলে যান বান্দরবান । পরে কাপ্তাই কক্সবাজার ।কক্সবাজারে তিনি সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের ছবি তোলার কাজে ফটোগ্রাফারকে হেল্প করতেন । বাচ্চাদের ঘোড়ার পিঠে তুলে চড়িয়েছেন । বিনিময়ে যে যা খুশি হয়ে দিত সেটি নিতেন । বান্দরবানে মাটি কাটার কাজ করেছেন । একেবারে নীলগিরি পর্যন্ত গিয়েছেন ।  চট্রগ্রাম থেকে জাহাজে করে গিয়েছেন খুলনাতে । সেখানেচিংড়ির ঘেরে কাজ করেছেন । এভাবে প্রতি বছরই ঘুরে বেড়ান তিনি ।

গরমকাল এলেই ফের ঢাকায় হাজির হন । ডাব বিক্রি শুরু করেন । কারওয়ান বাজারের ডাবের আড়তদার মুসা মিয়া তার এলাকার । ফলে ডাব নিয়ে বিক্রি করতে তার কোন সমস্যা হয় না ।

মেসের আলী বলেন , কারওয়ান বাজারকে  চোখের সামনে পাল্টে যেতে দেখেছি । আগে হাতিরঝিলের ওইদিক থেকে একটা বড় খাল এসে মিশেছিল এফডিসি বরাবর । গুটিকয় মানুষ কিছু জিনিষপত্র নিয়ে বসতো । কোন চাঁদাবাজি ছিল না । দালালি ছিল না । কিন্তু এখন কি অবস্থা আপনারা তো জানেনই ।”

মেসের আলী কুয়াকাটা , বরিশাল , সুন্দরবন , বগুড়া সব জায়গাতেই ঘুরেছেন ।

এই বেড়ানোর নেশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন , বুঝলেন আমি আকাশ দেখি । কতো বড়ো । এর নিচে কত কত দেশ । জায়গা । কত রকমের মানুষ । কত কি দেখার বাকি । তিনি বিমান আকাশে ওড়লে ভাবেন কোন দেশে যায় সেই বিমান ? যদি কখনো বিদেশ যেতে পারতেন । এই আক্ষেপ তার যেন সারা জীবনের ।

মেসের আলী বলেন , ” আমাদের দেশে কত বড় বড় ধনী দেশের মানুষদের ঘুরতে দেখি । তারা এসে আমাদের দেশ দেখে যায় । আমরা গরীব দেশের নাগরিক বলে ওইসব দেশে যাওয়ার ভিসাই পাই না । বেড়ানোতে আছে ধনী -গরিবের বৈষম্য । আমি বাঁচা অবস্থায় যদি আমাদের দেশ ধনী হইত তবে হয়ত দেখার চেষ্টা করতাম অন্য দেশ গুলো ।

মেসের আলী বিয়ে করেননি । তার বয়স হবে প্রায় ষাটের কাছাকাছি । এখনো সুঠাম দেহ । কোন অসুখ বিসুখ নেই । তিনি বলেন . ” ভাই কামলা  খাটি । শরীরে চর্বি জমার টাইম কই ? ঘুরে বেড়াই, মনে অসুখ জমার টাইম কই ?

ছোটবেলার স্মৃতি মাঝে মাঝে তাকে তাড়া করে । তিনি যখন খুব  ছোট তখনই তার বাবা নিরুদ্দেশ হন । মেসের আলীর বাবা তাবলীগে যোগ দিতেন দেশের বিভিন্ন স্থানে । কয়েকদিন পরপরই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তেন তিনি ।

মেসের আলীর আম্মা বলতেন ( নিজ স্বামী সম্পর্কে ) ” লোকটার খালি ঘোরার শখ । ”

মেসের আলীর এই নেশায় পেয়ে বসেছে কত বছর যে হোল । ঘর সংসার এজন্য করেননি । থাকেন কারওয়ান বাজারে মুসা’র আড়তেই । শীতকালটা বাইরে বাইরে ।

তার জীবনে প্রেমও এসেছিল । তিনি বলেন , ” রাঙামাটির এক রাখাইন নারী সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল । ওই নারীর বাড়ি শহরের কালিন্দিপুরে । এক সকালে মেসের আলী যান দোচোয়ানী  খেতে। সেখানে ওই নারীর সাথে তার পরিচয় । বিকেল অব্দি ছিলেন । সেই নারী পরে তার কাছ থেকে হাফ লিটার দো-চোয়ানির দাম রাখেননি ।

মেসের আলী বলেন , “এই যে দাম রাখেননি এইপাই প্রেম । অার আমার যে কি হয়েছিল সেদিন জীবনের সব কথা বলে দিয়েছিলাম । ”

কারওয়ান বাজারের আড়তের পাশে বসে তার সাথে আলাপ । ইফতারির আগে ডাব বিক্রির ধুম পড়ল ।

মেসের আলীর কাছ থেকে বিদায় নিলাম ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।