দুখুমিয়ার ডান পায়ে স্বপ্ন বুনন

তখন ঘড়িতে বিকেল পৌনে পাঁচটা। নীলক্ষেত থেকে বই কিনে ফিরছিলাম। বাসে উঠব বলে ফুটপাত ধরে হেঁটে চলছি। হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল ফুটপাতেরই এক ধারে। বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম অবাক দৃষ্টিতে। একটি জীর্ন শীর্ণ শিশু পথের ধারে বসে খাতা কলমে লিখছে। কি সুন্দর তার হাতের লেখা! দুঃখিত, সেটি হাতের লেখা নয়, বরং সেটি ছিল তার পায়ের লেখা। হ্যাঁ, ডান পা দিয়ে লিখছিল সেই ছোট্ট শিশুটি।

বাংলা ও ইংরেজী বর্ণমালা, সংখ্যা সবই পা দিয়ে লিখতে পারে সে। এমনকি নিজের নামটিও। কি নাম তার। জানতে চাইলাম।নামটি তার খাতার উপরেই লেখা ছিল। দুখু মিয়া। বয়স বার কি তের। তবে শরীরে ছিল না সেই বয়সের ছাপ। লিকলিকে জরাজীর্ণ ও রোগাক্রান্ত শরীর। হাত দুটিতে কোন বল নেই। শুধু চোখ দুটোই তাকিয়ে থাকে মায়াভরা দৃষ্টিতে। আর ডান পায়ে কলম চলে অবিরাম। কীভাবে হলো তার এই দুরারোগ্য ব্যাধি।

পাশেই বসেছিল তার মা। জানতে চাই তার কাছে। বলেন, জন্ম থেকেই তার  হাতের হাড় ভাঙা। হাত দিয়ে সে কিছুই করতে পারে না। তিন ছেলের মধ্যে দুখু মিয়াই তার বড় সন্তান্।

লিখতে শিখেছে কীভাবে জানতে চাইলে, তিনি বলেন, সেখানকারই একটি সরকারি স্কুলের ২য় শ্রেণিতে সে পড়ে। এটা কি প্রতিবন্ধীদের জন্য কোন বিশেষ স্কুল? মনে প্রশ্ন জাগল। কিন্তু না, এটা একটি সাধারণ স্কুল, যেখানে আর দশজন স্বাভাবিক শিশুদের সাথেই দুখু মিয়া পড়াশুনা করে। অবসরে এই ফুটপাতে ছেলেকে নিয়ে বসে। ছেলেটি তার লেখা চালিয়ে যায়। আর মা ছেলেটির জন্য পথচারীদের কাছে সাহায্য চায়। এই সামান্য সহযোগিতায় হয়তো বা কখনোই ছেলের চিকিৎসা করাতে পারবে না তার মা।

কিন্তু তার এই শিশুটিকে শিক্ষিত করার যে অসাধারণ উদ্যোগ ও দৃঢ় মনোবল ,তা হয়তো দুখু মিয়ার দুঃখ ভরাক্রান্ত  জীবনের গ্লানি কিছুটা হলেও কমাবে, যদি সমাজের মানুষ তার দিকে একটু সহযোগিতার হাত বাড়ায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।