দেলোয়ার আলীর কাছে কোন “পারভীন” এসেছিলেন?

তিনি দাড়ান । পাশে দাড়ানো পারভীনের মতো নারী । দেলোয়ার আলী এক সেকেণ্ড ভাবেন হয়ত পারভীনের জমজ বোন । তিনি জানতে চান , গফুর , উনি কি তোমার আম্মার জমজ বোন ?

দো’চালা টিনের বাড়ী, দুটো বড় ঘর। একটা বড় বারান্দা, বারান্দার একদিকে একটা রান্না ঘর। সামনে বড় উঠোন। উঠোনের একদিকে সিম গাছের মাচা, এরপর দেয়াল ঘেঁষে পাঁচ মিশালি কিছু ফুলের গাছ এর পরই টিনের সদর দরজা।

দরজায় কে যেন অনেক ক্ষণ ধরে নক করছেন।

দেলোয়ার আলী বারান্দায় বসে পেপার পড়ছেন। তিনি তাকিয়ে আছেন গেটের দিকে, কিন্তু তার উঠে যেতে ইচ্ছা করছে না। তিনি দরজায় নক করার শব্দ বুঝার চেষ্টা করছেন,

-এই ভর দুপুর বেলায় আবার কে এলো?

দেলোয়ার আলী দরজায় নক করার শব্দ শুনেই বলেই দিতে পারেন দরজায় বাইরে কে এসেছেন? তিনি মেহমান, ফেরিয়ালা, ফকির, পাওনাদার, দেনাদার, পাড়া প্রতিবেশি বা নতুন কোন মেহমানের আগমন সবই তিনি দরজায় টোকাদেয়ার শব্দ শুনেই বুঝে নেন। এই বোঝাটা বেশ রহস্যজনক । ষষ্ঠইন্দ্রীয় মনে হয় একই বলে ।  এই কারণে তিনি সদর দরজায় কখনো কলিং বেল লাগান না।

-সালাম ভাই সাহেব

-অয়ালাইকুম আস সালাম,

-আমারে চিনছেন ভাইসাব?

-না ঠিক চিনতে পারছি না।

-আমার নাম পারভিন বেগম। আমি রংপুরে থাকি। বছর সাতেক আগে আপনি আমার একটা উপকার করছিলেন। আমার একটা পোলা আছে। নাম আব্দুল গফুর। পোলাডা টাকার অভাবে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে পারতাছিল না, আপনে টাকা দিয়া সাহায্য করছিলেন।

-ওহ, হতে পারে আমার মনে নাই। আসেন ভিতরে আসেন।

-হয় ভাইসাব, খুব খিদা লাগছে ঘরে কোন খাওন আছে?

-না ঘরে তো কিছুই রান্না নাই।

-অসুবিধা নাই, আমি রান্না করতাসি, চাল নুন কৈ রাখছেন আমারে দেখায় দেন।

-পারভিন বেগম নিজেই রান্না ঘরে ঢুকে রান্না করতে বসেন, দেলোয়ার  আলী বারান্দায় বসে ভাবতে থাকেন, এই মহিলাকে তিনি আগে কোথাও দেখেছেন কি না। তিনি কোন ভাবেই মনে করতে পারছেন না পারভিন বেগমের কথা বা তার ছেলে আব্দুল গফুরের কথা।

-ভাই সাব

-বলো

-আপনে সারা জীবন মাইনষের উপকার কইরা আইসেন, আমার একটা উপকার আপনার করতেই হইবো, না করতে পারবেন না।

-আগে তো শুনি তোমার কথা

-ভাই সাব, আপনে তো জানেন, আব্দুল গফুরের বাপ কতো কষ্ট কইরা পোলাডারে বড় করসে, রোদ বৃষ্টি মাথায় লইয়া, বাজারে সবজি তরকারী বেইচ্চা খাইয়া না খাইয়া পোলাডারে মানুষ করসে।

-হ্যাঁ তো এখন কি হইসে?

-ভাইসাব, আব্দুল গফুরের বাপের এখন অনেক বয়স হইসে, সরিলে অনেক অসুখ বিশুখ বাসা বাঁধসে। কোন কাইজ কাম করতে পারে না। পয়সার অভাবে ওষুধ কিন্নাও খাইতে পারে না ভাইসাব। সারা দিন ঘরে বইয়া ঝিমায় আর কাঁদে।

-আপনি কানতেছেন কেন?

-কানতাসি কি আর স্বাদে? কতোটা বছর এই মানুষটার সাথে আমি ঘর করছি। মাটির মানুষ। জীবনে কোন দিন আমাকে কোন বকাঝকা করে নাই। যখন যা দিইসি তাই খাইসে। এখন লোকটা খুব কষ্ট পাইতাসে ভাইসাব। বাঁচার কষ্ট, ওষুধের কষ্ট, পয়সার কষ্ট।

-আমি কি করতে পারি?

-আব্দুল গফুর শিক্ষিত হইসে। পোলাডা ঢাকায় চাকরী পাইসে। চাকরী পাওয়ার লগে লগে পনেরো বছরের এক মাইয়ারে বিয়া কইরা অখন ঢাকায় থাকে। এর বাপের কথা বছরে একবারও মনে করে না ভাইসাব। কোন টাকা পয়সাও দেয় না।

-বলেন  কি?

-হয় ভাইসাব, আপনে তো ঢাকায় যাওয়া আসা করেন, আপনে পোলাডারে কইয়া কিছু একটা ব্যাবস্থা কইরা দেন ভাইসাহেব। হের বাপের কষ্ট আমি হজম করতে পারতাসি না।

-আচ্ছা দেখি কি করা যায়, আপনি আব্দুল গফুরের ঠিকানা টা আমাকে লিখে দিয়ে যান। আর রংপুরে আপনাদের বাড়ীর ঠিকানাটাও লিখে দেন।

-আইচ্ছা ভাইসাব, বড়ই শান্তি পাইলাম। ভাইসাব ভাত হইয়া গেসে, গাছে সিম ঝুলতাসে, সিম দিয়া আলু দিয়া ভাজি করি?

-হ্যাঁ করো, খুব ভালো হয়।

দেলোয়ার আলী পারভিন বেগমের কথা শুনলেও এখন পর্যন্ত তিনি হিসাব মিলাতে পারছেন না, এর আগে এই মহিলার সাথে তার কোথাও কখনো দেখা হয়েছে কিনা।

তিনি মনে মনে ভাবছেন কতো আন্তরিক ভাবে পারভিন বেগম রান্না করছে। মনে হচ্ছে যেন কতো আপন, কতো কাছের মানুষ। অথচ তিনি এখন পর্যন্ত পারভিন বেগম, বা তার ছেলে আব্দুল গফুরকে মনেই করতে পারছেন না।

পারভিন বেগম রান্না করে নিজে খান এবং দেলোয়ার আলীকে দেন। দেলোয়ার আলীর কাছে সিম ভাঁজি অত্যাধিক রকম ভালো লেগেছে। পারভিন বেগমের হাতের রান্না খুবই চমৎকার।

পারভিন বেগম ভাত খেয়ে চলে যান। দেলোয়ার আলী তাকে এক হাজার টাকা সাহায্য দিতে চাইলেও তিনি নেন না। আব্দুল গফুরের বাপের হাতে দিতে বলেন।

পারভিন বেগম চলে গেলেও, আব্দুল গফুরের বাপের জন্য দেলোয়ার আলী কষ্ট পাচ্ছেন। পারভিন বেগম তার কষ্টগুলি খুব সুন্দর করে দেলোয়ার আলীর মনে ঢেলে দিয়ে যান। এই ভাবেই মানুষ একজনের কষ্ট অন্যের মনের মধ্যে ঢেলে দেন। তিনি মনে মনে স্থির করেন, কালই ঢাকায় গিয়ে আব্দুল গফুরের সাথে দেখা করবেন।

তার আগে আব্দুলে গফুরের বাবার হাতে কিছু টাকা দিলে মন্দ হয় না। তাছাড়া ঢাকা থেকে রংপুর আরও কাছে।

দেলোয়ার আলী পরদিন সকালে রংপুর আসেন, তিনি পারভিন বেগমের ঠিকানা মতো আব্দুল গফুরের বাবাকে খুঁজে বের করেন।

আব্দুল গফুরের বাবা খুবই অসুস্থ, ঠিক মতো কথাও বলতে পারছেন না। নারাচাড়া করার মতো ক্ষমতাও নাই। দেলোয়ার আলী পারভিন বেগমকেও দেখতে পাচ্ছেন না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর তিনি পাশের বাড়ীর এক লোকের সাথে কথা বলেন,

-স্লামুয়ালাইকুম

-অলাইকুম আস সালাম

-আমার নাম দেলোয়ার আলী, আমি সিরাজগঞ্জ থেকে এসেছি। আমি আব্দুল গফুরের বাবা সম্পকে কিছু জানতে চাই। তিনি খুবই অসুস্থ, কথা বলতে পারছেন না।

-হয়, মেলা দিন হইলো উনি অসুখে ভুগতাসে। আমরা গ্রামের মানুষরা যখন যা পারি দুই টাকা পাঁচ টাকা দিয়া সাহায্য সহযোগিতা করি। আর বুঝেনই তো, এই গ্রামের ব্যাবাক মাইনসেই গরীব।

-আব্দুল গফুর তার বাপকে দেখতে আসে না?

-হেই কুলাঙ্গার পোলার কথা আর কইয়েন না। হেরে মানুষ করার লাইগ্যা হের বাপ সারাটা জীবন কতো কষ্ট করসে। নিজে না খাইয়া পোলারে খাওয়াইসে, পরাইসে। আর এখন? হেয় বড় লোক হইসে, বিদেশে (ঢাকা) চাকরী পাইসে। বিয়া করসে, বউ লইয়া বিদেশে থাকে। বাপরে ঘুইরাও দেখে না, বছরে একবারও আহে না। হেই রহম কুলাঙ্গার পোলা যেন আল্লায় শত্রুর ঘরেও না দেয়।

-আব্দুল গফুরের মাকে দেখছি না যে?

-ভাইজান মনে হয় মেলা বছর পর আইসেন?

-হ্যাঁ, আমি এই প্রথম আসলাম মনে হচ্ছে।

-পারভিন বেগম আপনার কে হয়?

-কেউ হয় না, আব্দুল গফুর পূর্ব পরিচিত বলতে পারেন।

-ওহ, আব্দুল গফুরের মা তো আরও পাঁচ বছর আগেই মারা গেছে।

-মারা গেছে?

-হ্যাঁ, কালা জ্বর হইসিলো, সাত দশ দিন জ্বরে ভুইগা মারা গেছে। খুবই ভালো মানুষ ছিল পারভিন। পারভিনের শোকে শোকে এই লোকটার আজ এই দশা।

দেলোয়ার আলী নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। পারভিন বেগম যদি মারা যায়, তাহলে গতকাল তার বাসায় কে আসলো?

-আপনি কি ঠিক বলছেন, পারভিন মারা গেছে?

-ওমা! এইডা কি কন? আমরাই তো পারভিনের লাশ দাফন করছি। আমার মাইয়ার লগে পারভিনের একটা ছবি আছে, খাড়ান লইয়া আসি।

পাশের বাড়ীর লোকটি তার মেয়ের সাথে তোলা পারভিনের একটা ছবি ফজর আলীকে দেখান। দেলোয়ার আলী ছবি দেখে অবাক হয়ে যান,

-হ্যাঁ, এই তো পারভিন, যে কাল বাসায় এসে ভাত সিম ভাঁজি রান্না করে গেছে।

দেলোয়ার আলী কোন হিসাব মিলাতে পারছেন না, তিনি একটা রিক্সা ভ্যান ডেকে নিজ খরচায় আব্দুল গফুরের বাবাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন এবং পরদিন আব্দুলে গফুরের খোঁজে তিনি ঢাকায় আসেন।

অনেক খোঁজা খুঁজির পর তিনি আব্দুল গফুরকে খুঁজে পান, এবং তার কাছে থেকে জানতে পারেন, তার মা আরও পাঁচ বছর আগেই মারা গেছেন।

আব্দুল গফুর তার বাবাকে না দেখার কোন কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে না। তবে এর জন্য তিনি তার স্ত্রী’র দোষ দেন। তিনি তার বাবার জন্য দেলোয়ার আলীর কাছে ক্ষমা চান।

দেলোয়ার আলী আব্দুল গফুরকে সাথে নিয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসেন, কিন্তু তিনি আব্দুল গফুরের বাবাকে যে বেডে রেখে গেছিলেন সেখানে দেখতে পাচ্ছেন না।

তিনি নার্সিং রুমে ঢুকে এক ডাক্তারের সাথে কথা বলেন,

-স্লামুয়ালাই কুম

-অলাইকুম সালাম

-আমার নাম দেলোয়ার আলী,

-জী বলুন

-আমি গতকাল একজন অসুস্থ বৃদ্ধ মানুষকে ভর্তি করে গেছিলাম। তার সিট পরেছিলো, চব্বিশ নাম্বার ওয়ার্ডে সাইত্রিশ নাম্বার বেডে। আজ উনাকে দেখতে পাচ্ছি না।

-আপনি উনার কে হন?

-আমি তেমন কেউ হই না, তবে এ হচ্ছে তার ছেলে আব্দুল গফুর।

-ওহ, উনি কাল শেষ রাতে মারা যান। আমরা তার লাশ মর্গে রেখেছি, আপনি সেখান থেকে লাশ নিতে পারেন।

সাথে সাথে দেলোয়ার আলীর চোখে পারভিন বেগমের চেহারা ভেসে উঠে। তিনি পারভিন বেগমকে কথা দিয়েছিলেন, তিনি তার স্বামীকে ভালো রাখার জন্য চেষ্টা করবেন এবং তার ছেলেকে আনবেন, অথচ তিনি তেমন কিছুই করতে পারলেন না।কিন্তু দেলোয়ার আলী কোনভাবেই এখনও হিসেব মিলাতে পারছেন না তার কাছে তবে পারভীন নামের কে গিয়েছিল । জগত অতি রহস্যময় এটি দেলোয়ার আলী জানেন । হ্যালুসিনেশন নামের একটি রোগ আছে সেটিও তিনি জানেন । কিন্তু কে তার বাড়িতে যাওয়া পারভীন ?

মাস দুয়েক পর তিনি লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থেকে বাসে করে রংপুরে ফিরছেন । দেখেন তার দুই সিট পরেই যে ভদ্রমহিলা বসে আছেন তিনি পারভিন বেগম । পাশে বসা আব্দুল গফুর ।

তিনি ভয় পান । সারা রাস্তা মুখ ফিরিয়ে থাকেন । রংপুর বাস পৌছার পর দেলোয়ার আলী নামছিলেন যখন তখন আব্দুল গফুর ডাক দেয় । তিনি দাড়ান । পাশে দাড়ানো পারভীনের মতো নারী । দেলোয়ার আলী এক সেকেণ্ড ভাবেন হয়ত পারভীনের জমজ বোন । তিনি জানতে চান , গফুর , উনি কি তোমার আম্মার জমজ বোন ?

গফুর না করে ।

দেলোয়ার আলী আর কথা না বাড়িয়ে হাটতে থাকেন দ্রুত । তাকে ট্রেন ধরতে হবে ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।