দেশগড়ি’র জন্য আপনার সাংবাদিকতা

 

মধ্যরাতের আগে একটি দৃশ্য
স্থান : কাওরান বাজার
রাত ১১ টা
ট্রাক বোঝাই মিষ্টি কুমড়োগুলো নামানোর জন্য ব্যস্ত পাঁচ-ছয়জন কুলিশ্রমিক। ট্রাক থেকে একটার পর একটা মিষ্টি কুমড়ো ছুড়ে দিচ্ছে নিচের কুলিদের হাতে, তারা নামিয়ে রাখছেন একটা ঝুড়িতে। আরও কয়েকজন সেই ঝুড়িগুলো নিয়ে যাচ্ছে আড়তে। হঠাৎ ঝুড়ি থেকে একটা কুমড়ো গড়িয়ে পড়লো। হঠাৎ পাশের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসলো একটা নয়-দশ বছরের একটি ছেলে, ছো মেরে মুকড়োটা নিয়ে দোড় দিল। একটা চিৎকার উঠলো, এই এই… ছেলেটি খিলখিল হাসির শব্দ তুলে দৃষ্টিসীমার আড়ালে পালিয়ে গেল। ও জানে ধরলে, ধরা পড়লে ওর কপালে জুটবে কয়েকটা চড়, মুখের গালি। সে এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। শুধু হাতের কুমড়োটি নিয়ে যাবে। তাকে আবার অপেক্ষা করতে হবে আরেকটি ট্রাকের পাশে। এমনি করে লাউটা, পেপেটা, বাধাকপি বা লেবুটা নিয়ে যাওয়ার জন্য।
খুব সাধারণ একটা দৃশ্য।
আপনি যদি তার সঙ্গে খানিকটা সময় কাটান, তাহলে দেখবেন ওরা কে কয়টা চড় খেল। সেটাও নিজেদের মধ্যে একটা গল্পের বিষয়।
আপনার আমার সবারই মনে হবে, খুবই সামান্য এই ঘটনা।

একটি প্রশ্ন
কিন্তু আপনার সংবেদনশীল মন যদি প্রশ্ন করে ওঠে।
এটার পরিণতি কি?
আপনি অনুসন্ধানে নামলেন। এটিই সাংবাকিতার প্রথম পাঠ।
প্রথমেই আবিস্কার করার চেষ্টা করলেন ছেলেটিকে।
আপনি একটু অপেক্ষা করলেই ছেলেটির দেখা পেয়ে যাবেন।
তার সাথে কথা বললেন, জানলেন রেললাইনের পাশের বস্তিতে সে থাকে। লেখাপড়ার সুযোগ সে পায়নি। তার বাবার খবর সে জানেও না। মা টুকটাক যা কাজ করেন তা দিয়ে তিনবেলা খাবারও জোটে না। বস্তির অন্য ছেলেদের দেখাদেখি সেও এই ছো মারার দলে যোগ দিয়েছে। যা পায় তা দিয়ে টুকটাক কিছু কিনে খায়। না হলে মায়ের হাতে দিয়ে দেয়। মা রান্না করে খাওয়ায়। অথবা তার কেউ নেই। কোন ভ্যানের ওপর, মাল বোঝাই বস্তার ফাঁকে, অফিসের বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়ে।
আপনার মনে হলো, কতজন শিশু এভাবে বেড়ে উঠছে?
আপনার প্রথমে মনে হবে বিশ-ত্রিশ জন। আপনি কয়েকজনের সাথে কথা বললেন। এরা কেউ বাজারের আড়তদার, কেউ কুলি, কেউ বস্তিবাসী।
আপনি জানলেন, এই এলাকাটুকুতেই এরকম শিশুর সংখ্যা আড়াইশোর কম না।
তাও এটা একটা ধারণা। সংখ্যাটা আরও অনেক বেশিও হতে পারে।

অন্ধকার আগামীর গল্প
এই শিশুগুলো শুধু যে ট্রাক থেকে পড়ে যাওয়া তরকারী বাগিয়ে নিয়ে যায় তা নয়। এ কাজে হাত পাকিয়ে সে উঠে পড়বে যানজটে আটকে থাকা ডিম বোঝাই কোন লরিতে। সটাসট দু-তিন কেস ডিম নিয়ে লাফিয়ে পড়বে চলন্ত গাড়ি থেকে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যেটা হলো, আরেকটু বড় হলে জড়িয়ে পড়বে মাদকের সাথে। আস্তে আস্তে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজী, ভাড়াটে মাস্তান এমনকি হত্যা আর খুনের মত অপরাধের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়বে।
আপনি যদি চেষ্টা করেন, তাদের কয়েকজনের সাথে দেখাও হয়ে যেতে পারে।
আপনি তাদের সাথে কথা বললেন।
তাদের ইতিহাসটা জানার চেষ্টা করলেন। কেমন করে তারা এ পথে আসলো।
আপনি যদি তাদের ঘৃণা বা তাচ্ছিল্য না করেন, তাদের সহানুভূতির সাথে বুঝতে চেষ্টা করেন-
তাহলে অনেক কিছুই জানতে পারবেন।
আপনি বুঝতে পারবেন, তারা কি পায়নি- যা তাদের পাওয়ার কথা ছিল। যার কারণে আজ তারা সুস্থ জীবন হারালো।

কারণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে পরিবর্তনের দিশা
যদি তাদের ছোটবেলায় শিক্ষা, খাদ্য, বাসস্থান আর সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা থাকতো তাহলে এই তারা অপরাধের সঙ্গে জড়াতো না।
আপনার মনে হবে এই যে অপরাধীরা তাদেরও সুস্থ পূর্ণবাসন সম্ভব। আপনি সেটার পথগুলোও আবিস্কার করতে পারেন।
পথটা কঠিন মনে হয় না। মনে হবে তাদের কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে সুস্থ সামাজিক ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা।
এক্ষেত্রে প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে কে এই কাজটা করবে? কার দায়িত্ব এটি।

 

 

দেশগড়ি’র সাংবাদিকের মন
সাংবাদিকের অনেক উদ্দেশ্য থাকে। দেশগড়ি’র সাংবাদিকের প্রধান উদ্দেশ্য। তার সংবাদটি দেশ ও মানুষের শুধু একটি সংবাদ নয়, উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য একটি উদ্যোগ হিসেবে এটিকে প্রকাশ করা। এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, স্বচ্ছল নাগরিক যারা এই দেশটি সুন্দর করে গড়ে তুলতে চাই, তারা সবাই যদি চাই তাহলে এই কাজটি কোনও কঠিন কাজ নয়। প্রতিটি এলাকার এরকম সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের চিহ্নিত করলে দেখা যাবে, ঐ এলাকার সবাই মিলে যৌথ উদ্যোগ নিলে ঐ সব সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা এবং ভালভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরী করা খুব কঠিন নয়।
আড়াইশো শিশুকে গড়ে তোলার খরচ নিশ্চয় আড়াইশো অপরাধীকে নিয়ন্ত্রণ করার খরচের চেয়ে কম।
এর বদলে এরকম একজন শিশু যখন উৎপাদনমুখী জীবনে ফিরে যাচ্ছে সে যে সমাজের জন্য মূল্য তৈরী করছে তার মূল্যও অনেক বেশি। তাহলে আমরা তা পারছি না কেন?
প্রশ্নটা সবজায়গারই। একজন দেশগড়ি’র সাংবাদিক হিবেসে আপনার সামনে ঘটে যাওয়া সমস্যাগুলোর মৌল ব্যাপারগুলোকে সামনে নিয়ে আসা।
আপনি যে এলাকারই হন না কেন, আপনি এরকম শিশুর দেখা পাবেনই। এই কাহিনীটি হৗতো কাওরান বাজারের কিন্তু এরকম ঘটনা আপনার এলাকাতেই ঘটে চলেছে। অবহেলিত শিশুরা অপরাধের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ছে প্রতিদিনÑ শুধুমাত্র তার শিক্ষা, আহার, সুস্থ বিনোদন, সুচিকিৎসা আর আবাসনের মৌলিক অধিকারটুকুর অভাবে।
আপনি আপনার এলাকার এরকম শিশুদের কথা তুলে ধরতে পারেন।
এটাই হতে পারে সবাই মিলে সমস্যাটা সমাধান করার পথে প্রথম পা ফেলা।

সবার সাথে পায়ে পায়ে
আপনি যখন প্রথম পা-টি ফেলবেন তখন দেখবেন আরেকজনও আপনার সাথে পা ফেলছে। আপনার দেখানো পথ ধরে অন্য কেউ এগিয়ে গেছে আপনার চেয়েও বেশি। আপনার একটি তথ্য থেকে গড়ে উঠতে পারে সমাধানের রাস্তা।
আপনি নিশ্চয় চাইবেন, এই সমস্যাটি সমাধান করা যাদের দায়িত্ব তারা যেন এই সমস্য দূর করার ব্যাপারে উদ্যোগী হন। এ বিষয়ে আপনার আমার প্রথম কাজটি হচ্ছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষটির কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দাবী করা যা এই সমস্যার সমাধান আনতে পারে।
কারা সেই মানুষ?
প্রথম দায়িত্ব এলাকার জনপ্রতিনিধির। এলাকাটি যেন সুন্দরভাবে পরিচালিত হয় সেই লক্ষ্যে এলাকার মানুষ তাকে নির্বাচিত করেছে। এলাকার যে কোন সমস্যা দূর করা তার প্রধান দায়িত্ব।
সেই জনপ্রতিনিধি হতে পারেন আপনার গ্রামের মেম্বর, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, নগর এলাকার কাউন্সিলর, শহরের মেয়র, সংসদীয় আসনের সাংসদ। এদের সবারই দায়িত্ব তার এলাকাটিকে ভাল রাখা। এলাকার জনগণের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা। এলাকার মানুষের মৌলিক অধিকারটুকু যেন সবাই পায় সেই লক্ষ্যে কাজ করা। অতএব আপনি জনপ্রতিনিধির কাছে গেলেন। আপনার অভিজ্ঞতার কথা শুনে তিনি প্রথমেই বলবেন, এটি একটি সমস্যা। তিনি এটা সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেবেন।
একজন নাগরিক হিসেবে আপনারও দায়িত্ব হবে সেই উদ্যোগকে সফল করা।
এই লক্ষ্যে, আপনি তার কাছে জানতে চাইবেনÑ উদ্যোগগুলো কি। সুনির্দিষ্টভাবেই তা জানতে চাইবেন এবং গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এই উদ্যোগুলো কবে, কিভাবে বাস্তবায়িত হবেÑ এ বিষয়ে তার সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানতে চাইবেন। সমাধানের জন্য ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মিথ্যা বড় আশ্বাসের চেয়ে প্রয়াগযোগ্য ছোট উদ্যোগও অনেক বেশি কার্যকর।
কিন্তু কি উদ্যোগ নেবেন তিনি? আপনি তার কাছে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী জানতে চাইবেন।
কি কি করবেন আপনি? কবে?
জনপ্রতিনিধি বলবেন, তিনি কিভাবে এটি দূর করবেন।
আপনি সেটা প্রকাশ করুন। খোঁজ রাখুন। নির্ধারিত সময়ে কাজ হলে সেটাও প্রকাশ করুন। না হলে সেটাকে আবার তার নজরে আনুন। সমাজের প্রতি আপনার দায়বদ্ধতা থেকে আপনি সেটা করুন। আপনি হয়ে উঠুন আপনার এলাকার উন্নয়নের জন্য, মানুষের মঙ্গলের জন্য, দেশগড়ি’র একজন সংবাদ কর্মী, উন্নয়নের উদ্যোক্তা।

দেশগড়ি’র সাংবাদিকতা : উন্নয়নের জন্য আপনার এক উদ্যোগের নাম
আমাদের চারপাশে চলতে থাকা অনিয়ম সর্ম্পকে আমাদের নিরবতা, এই অনিয়মগুলোকে চলতে সাহায্য করে। এখানেই জন সাংবাদিকের বা উন্নয়ন সাংবাদিকতার প্রয়োজন। আপনার এলাকার উন্নতিতে আপনার পর্যবেক্ষণ, আপনার কথা- চলতে থাকা এই অনিয়মকে বন্ধ করে আপনার এলাকাকে আরও সুন্দর করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রে দেশগড়ি আপনার উন্নয়ন প্রচেষ্টার একটি অংশীদার হতে চায়।
এরই ধারাবাহিকতায় আপনি যুক্ত করতে পারেন এলাকার রাজনৈতিক দলগুলোকেও। রাজনৈতিক দলগুলোও দেশের উন্নয়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। যদিও এলাকার সমস্যা দেখা, সেটার সমাধানে কোন কার্যক্রম দেখা যায় না- কিন্তু দেশের উন্নয়নের প্রশ্নে, এলাকার উন্নয়নের প্রশ্নে তাদেরকে যুক্ত করতেই হবে।
সেটার শুরু হতে পারে আপনার এলাকার রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে। আপনি আপনার এলাকার রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের তাদের এলাকার সমস্যাগুলো নিয়ে তাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তুলুন। এটাই তাদের রাজণিিত হওয়া উচিৎ। আপনার মধ্য দিয়েই একজন রাজনৈতিক কর্মীর উন্নয়ন সংস্কৃতির জন্ম হতে পারে। এই শিশুদের শিক্ষা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো কি করতে পারে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করুন। তাদের ভাবনার দরজা খুলে দিন। যেন তাদের হাত দিয়ে গড়ে উঠতে পারে আপনার এরাকার উন্নয়ন কেন্দ্রিক রাজনীতির চর্চা।
আপনি কথা বলুন প্রশাসনের সাথে। দেশের নাগরিক হিসেবে আপনার এলাকার যে কোন সমস্যা নিয়ে আপনি তাদের সাথে কথা বলতে পারেন। আপনার সচেতন ভূমিকা প্রশাসনকে আরও জনকল্যাণমুখী হয়ে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে। তাদের কর্তব্যের প্রতি আরও দায়িত্ববান হতে সাহায্য করবে। জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
আমরা সবাই যদি আমাদের নিজ নিজ এলাকার এ বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন থাকি তাহলে একটু একটু করে গোটা দেশেই জনকল্যাণমুখী, জবাবদিহিতামূলক সুস্থ সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবো। আর এ লক্ষ্যে একজন সচেতন ছাত্র হিসেবে, একজন সুনাগরিক হিসেবে, একজন সামাজিক উন্নয়নের উদ্যোক্তা এবং কর্মী হিসেবে, সর্বোপরি একজন মানুষ হিসেবে আমরা সবাই যেন নিজের চোখ খোলা রাখি, কান পেতে মানুষের কথা শুনি এবং প্রকাশ করি।
আপনার এলাকার বিশেষ কোন সমস্যা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধান, অভিজ্ঞতা দেশগড়ি তে প্রকাশ করুন।
আপনার এলাকা, আপনার মানুষ, আপনার দেশÑ এর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠুন। চোখ হয়ে উঠুন। হাত হয়ে উঠুন। দেখবেন আমরা সবাই মিলে কল্যাণের পথে একটু হলেও এগিয়ে গেছি।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।