দেশের প্রথম কীটপতঙ্গের ডিএনএ বারকোডিংল্যাব

আমরা একটি প্রাণীর বারকোড জেনে এর নামকরণ ও শ্রেণীবিন্যাস করি।যেমন মানুষের সবচেয়ে কাছের আত্মীয় শিম্পাঞ্জির সাথে মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ এর পার্থক্য মাত্র পাঁচ শতাংশের (৫%) কম বা বেশি।মানুষের ডিএনএ কোড হচ্ছে ………ATCGAT আর শিম্পাঞ্জির হলো …..ATCGAA . শুধুমাত্র একটি কোড এর পার্থক্যের জন্য আমরা মানুষ আর ওরা শিম্পাঞ্জি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২ শে মে উদ্বোধন হয় দেশের প্রথম কীটপতঙ্গের ডিএনএ বারকোডিং ল্যাব।বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের তত্ত্বাবধানে এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে  “হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহান্সমেন্ট প্রোজেক্ট(হেকেপ)” বাংলায় “উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধিকরন প্রকল্প” এর আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষনা কারখানায় স্থাপন করা হয়েছে “এনহান্সমেন্ট অব এনটোমোলজিক্যাল রিসার্চ ক্যাপাবিলিটি ইউজিং ডিএনএ বার কোডিং” ল্যাব।এই ল্যাবের সার্বিক পরিচালনা ও দেখভালের দায়িত্বে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ । বিভাগের শিক্ষকদের চার অধ্যাপক বিশিষ্টি একটি দল এটি পরিচালনা করছে।এনারা হলেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক এবং জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুল জব্বার হাওলাদার এ প্রকল্পের সাব-প্রজেক্ট ম্যানেজার(এসপিএম)।প্রকল্পের ডেপুটি সাব-প্রজেক্ট ম্যানেজার (ডিএসপিএম) হিসেবে আছেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. মনোয়ার হোসেন।এবং অন্য দুই সদস্য হলেন অধ্যাপক ড. আবু ফয়েজমো.আসলাম ও অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার।
এবার প্রথমেই জেনে নেই ডিএনএ বারকোডিং কি। পৃথিবীর সকল প্রজাতির জীবের নির্দিষ্ট কতগুলো ডিএনএ কোড নম্বর বা জীন সিকোয়েনসিং, আরো সহজে বললে নাম থাকে । যা একটি জীবের ডিএনএ কোড নম্বর অন্য জীবের থেকে আলাদা করে । আর এই কোডটি সংরক্ষিত থাকে জীবকোষের ক্রোমোজমের ডিএনএ তে।তাই জীবের এই জীন সিকোয়েন্সিং বা কোড জানার পদ্ধতিকেই বলে ডিএনএ বারকোডিং।যা আমরা একটি প্রাণীর বারকোড জেনে এর নামকরণ ও শ্রেণীবিন্যাস করি।যেমন মানুষের সবচেয়ে কাছের আত্মীয় শিম্পাঞ্জির সাথে মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ এর পার্থক্য মাত্র পাঁচ শতাংশের (৫%) কম বা বেশি।মানুষের ডিএনএ কোড হচ্ছে ………ATCGAT আর শিম্পাঞ্জির হলো …..ATCGAA . শুধুমাত্র একটি কোড এর পার্থক্যের জন্য আমরা মানুষ আর ওরা শিম্পাঞ্জি।এখানের প্রত্যেকটি ইংরেজী লেটার এক একটি নিউক্লিওসাইড রিং কে নির্দেশ করে।যেমন- এ তে এ্যাডেনিন, সি তে সাইটোসিন, জি তে গুয়ানিন, টি তে থাইমিন।এভাবে প্রত্যেকটি জীবেরই একটি নির্দিষ্ট ডিএনএ কোডিং আছে।
এখন আসি কীটপতঙ্গের এই ডিএনএ কোড নম্বর আমাদের কেন জানতে হবে।পৃথিবীতে যত প্রকারের প্রাণী আছে তার শতকরা আশি ভাগই(৮০%) হল এই কীটপতঙ্গ।যার পঞ্চাশ ভাগ এখনো মানুষের অজানা অর্থাৎ এখনো পৃথিবীর অর্ধেক প্রকার ডিএনএ বারকোডিং আবিষ্কার হয়নি।।আর প্রতিটি প্রাণীর জীবনচক্র,প্রজনন,স্বভাব-ব্যবহার,বাসস্থান,খাদ্যাভ্যাস নির্দিষ্ট থাকে এই ডিএনএ এর মধ্যে। যা প্রজননের সময় বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে চালিত হয় এই ডিএনএ এর মাধ্যমে।এজন্যই ডিএনএ কে বলা হয়ে থাকে বংশগতির ধারক ও বাহক।আর কোন পোকা ফসলের জন্য ভালো কোনটি ক্ষতিকর, কোনটি রোগজীবানু ছড়ায়, কোনটি থেকে ভালো ঔষধ আবিষ্কার করা যাবে এইসব কিছুই জানা যাবে ঐ পোকার ডিএনএ বারকোডিং করে।তাই নতুন কোন পোকা আবিষ্কার করে এর বৈশিষ্ট্য জেনে এবং অন্যান্য উপকারী ও অপকারী পোকার বৈশিষ্ট্য বা ফিচার নির্দিষ্ট করে এর সঠিক নামকরণ  ও শ্রেণীবিন্যাস করার জন্য ডিএনএ বারকোডিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এবার জেনে নিই এই ডিএনএ বারকোডিং করার জন্য এই ল্যাবে কি কি যন্ত্র পাতি আছে।ইলে্ক্ট্রিক মাক্রোসকোপ, সেন্টিফিউজার, মাইক্রোটমমেশিন, স্টেরিলাইজার, ন্যানোড্রোপ, থার্মালসাইক্লারবাপিসিআর, ইনকিউবেটর, ফ্লুরোসেন্সমাইক্রোসকোপ, জেলডকুমেন্টেশনসিস্টেম, শেইকারইনকিউবেটর, আল্ট্রাপিউরওয়াটারসিস্টেম ও অন্যান্যল্যাবোরেটরিগ্লাসওয়ার ।
এবার জানা যাক কিভাবে এই ডিএনএ বারকোডিং করা হয় ।প্রথমেই যে পোকার বা প্রাণীর বারকোডিং করা হবে তার স্যাম্পল বা নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। এজন্য প্রাণীর শরীরের যেকোন অংশ বা রক্ত হলেও এটি করা যায়।এরপর এই নমুনা থেকে ডিএনএ কে আলাদা করতে হবে যাকে বলে ডিএনএ এক্সট্রাকশন।  এরপর এই জিনোমিক ডিএনএ কে ন্যানোড্রোপ  এর মাধ্যমে সংগৃহীত ডিএনএ টির গুনগত ও পরিমানগত মান নির্ণয় করতে হবে যাকে বলে পিউরিফিকেশন।যদি ডিএনএ টির কাঙ্খিত মান থাকে তারপর পিসিআর এর মাধ্যমে প্রাইমার ডিএনএ এর বহু কপি তৈরি করতে হবে যাকে বলে এ্যামপ্লিফিকেশন।এরপর জেল ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে এর মানদেখে এটি সিকোয়েন্সিং এর জন্য প্রস্তুত করতে হয়।এরপর সিকোয়েন্সিং করে এটি জিন ব্যাংক এর তথ্যের সাথে মিলাতে হবে।সেখানে যদি এটি কোন নতুন সিকোয়েন্সিং দেয় অর্থাৎ ব্যাংক জমা রাখা কোন কোড এর সাথে না মিলে তাহলেই নতুন কোন প্রাণীর অস্তিত্ব নিশ্চিত হবে।এছাড়া প্রাণীর বায়ো ইনফরমেটিক এনালাইসিস করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবগত হওয়া যাবে।বর্তমান বিশ্বে যে জিন ব্যাংক রয়েছে তা হল ডিএনএ ডাটাব্যাংক অব জাপান “ডিডিবিজে” এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ‘এনসিবিআই” ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন।
বারকোডিং ল্যাব এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে এই ল্যাবের ডিএসপিএম অধ্যাপক ড. মনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের প্রথম লক্ষ্য হল অপরিচিত সকল পোকামাকড়ে চিহ্নিত করা।এরপর ভালো ও উপকারি পোকার বৃদ্ধি এবং অপকারী পোকার দমন করে ফসলের বৃদ্ধির জন্য কাজ করা। এবং বিভিন্ন পোকামাকড়ের বিবর্তন জনিত সম্পর্ক নিয়ে গবেষনা করা। আমাদের দেশের বিশেষ করে সুন্দর বনের যে সব এন্ডেমিক প্রজাপতি, ফড়িং, মথ, বিটল, মৌমাছি  ও অন্যান্য পোকা নিয়ে বিস্তর গবেষনা করা।
ল্যাবে বর্তমানে এমফিল, পিএইসডি, স্নাতকোত্তর ও স্নাতক পর্যায় প্রায় ১০ জন শিক্ষার্থী গবেষনা করছে।এছাড়া ল্যাবের তত্ত্বাবধায়নে বারকোডিং বিষয়ক বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করে থাকে। ল্যাবে গবেষনায় নিয়োজিত শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পোকামাকড় নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।তাদের সাথে কথা বললে তারা বলেন আমাদের দেশে প্রথম পোকামাকড়ের ডিএনএ বারকোডিং নিয়ে কাজ হচ্ছে আমরা এর অংশ হতে পেরে ভাল লাগছে। এছাড়া বিভিন্ন উপকারি পোকার বিভিন্ন দিক উন্মোচিত করে আমরা অবদান রাখতে পারবো।
ডিএনএ বারকোডিং ল্যাব নিয়ে এর প্রধান(এসপিএম) সাব-প্রজেক্ট ম্যানেজার অধ্যাপক ড. আব্দুল জব্বার হাওলাদার বলেন, মলিকুলার পর্যায় কাজ করার জন্য সব যন্ত্রাংশই এখানে আছে।গবেষনার জন্য এটি প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সকল শিক্ষার্থী-শিক্ষক এবং জীববিজ্ঞান অনুষদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের  শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের  জন্যও এটি উন্মুক্ত।এরপরেও বাংলাদেশের যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের জন্য এখানে গবেষনা করার সুযোগ আছে। এই ল্যাবে আমরা কৃষি ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পোকার ডিএনএ  বারকোডিং  করবো।এছাড়া বছরে দুইবার ডিএনএ বারকোডিং এর উপর সম্মেলন ও কর্মশালার ব্যবস্থা করা হবে।সর্বোপরি আমি মনে করি এটি দেশের জীববিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার  জন্য একটি পাথেয়ও। দ্ক্ষ বারকোডিং গবেষক তৈরি করে দেশে ও দেশের বাইরে শিক্ষার্থীরা অবদান রাখতে পারবে।

২৯/১১/১৭
আদীব মুমিন আরিফ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।