ধোঁয়া আগুনের রেস্টুরেন্টে আবিরের বন্দী জীবন

ধানমন্ডি ১৫ স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে এগোতেই চোখে পড়ে অনেক গুলো ছোট রেস্টুরেন্ট। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে দুপুরের খাবার এবং সন্ধায় হালকা ক্ষিদে মেটাবার জন্য পুরি, পেঁয়াজু, আলুর চপসহ নানা খাবার পরিবেশন করে থাকেন এই রেস্টুরেন্টগুলো।
ঠিক এমনই এক রেস্টুরেন্টে কাজ করে সাধা-সিধে আবির নামের একটি ছেলে। কাজ আর ক্লান্তিরও ফাঁকে গুনগুনিয়ে গান ধরা তার প্রতিদিনের অভ্যাস। এই রেস্টুরেন্টেই সকাল ৭টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত কাজ করে সে। হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ফাঁকেই সে গুন গুনিয়ে আওয়াজ তোলে তার কন্ঠে। ঠিক সেই আওয়াজই কানে বাজে অনেকের। হয়তো আগ বাড়িয়ে কেউ নামটা জিজ্ঞেস করে অথবা কেউ অবজ্ঞার সুরে ভ্রক্ষেপ ও করেন না। গায়ে ছেড়া একটা গেঞ্জি পরনে ময়লা লুঙ্গি। কিন্তু কথায় মাধুর্যতা যেন উপচে পড়ে আবিরের। যে কারোরই দেখে মনে হবে সাধা সিধে গ্রামের অশিক্ষিত ছেলে। জীবনের তাড়নায় আজ সে এখানে। কিন্তু না। সাধারনের ভেতরে অসাধারন আবিরের গল্পটা অন্যরকম কিছুটা।
আবির সরকারী বাঙলা কলেজে প্রানী বিদ্যা বিষয়ে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। কর্মজীবি ছাত্র হিসেবে স্নাতক ভর্তি হয়েছিলো। পার হয়ে গেছে স্নাতকের প্রায় দেড় বছর। সারা দিন কাজের ফাঁকে রাতে টুকটাক পড়াশোনা আর মনের অজান্তেই গুনগুনিয়ে গান ধরে আবির। এ কাজটা ও নাকি বেশি দিন আর করতে পারবে না। রেস্টুরেন্টটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অন্য কোথাও কাজ খুঁজতে হবে আবিরের। নয়তো পেট চালানো যাবে না। পড়াশোনার প্রশ্ন সেখানে আসে কোথেকে?
আবিরের বাড়ি খুলনার দৌলতপুরে। আবিরের শৈশবেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে তার বাবা মায়ের। নানীর কাছে বড় হয় আবির। প্রথম দিকে বাবা খোঁজ খবর রাখলে ও অনেক বছর হলো কথাই হয়না বাবার সাথে। মা আবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই আবিরের কাজ করে পেটের ভাত যোগাতে হয়েছে। নানী ছিলো শুধু মাত্র ছায়ার মতো। মামা মামিদের হাত থেকে পিঠ বাঁচানোর মত কেউ একজন। অষ্টম শ্রেনী পাশ করে আবির চলে আসে ঢাকায় । মামার বাসায় কিছু দিন থাকার পরে সেখানে জল ঘোলা হয়ে যেতে থাকে। আর থাকা যায়না সেখানে। মামা মিরপুরের এক হোটেলে থালা বাসন ধোয়ার চাকরী নিয়ে দেন। ঠিক তারই মধ্যে আবির উর্ত্তীন হয় নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায়। উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য ভর্তি হয় সরকারী বাঙলা কলেজে। কাজ করে উপার্জনের টাকায় চলে পড়াশোনা। সেখানে ও আবির সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয় এবং মায়ের সহযোগিতায় স্নাতর ভর্তি হয় একই কলেজে।
গান করা হয় কবে থেকে জানতে চাইলে আবির বলেন, ‘আমাদের আবার গান? ভালো লাগে তাই গাই। শেখার সুযোগ তো আমাদের জন্য নয়। খুলনায় এক মামার কাছে সন্ধার পরে বসতাম। মামা গান শোনাতে বলতেন আর আমি তাকে গান শোনাতাম। বিনিময়ে মামা আমাকে মাঝে মাঝে চকলেট, বিস্কুট কিনে দিতেন। সব থেকে বড় বিষয় মামা আমায় খুব স্নেহ করতেন। আর সেখান থেকে গানের শুরুটা।’ আরেকটা চমৎকার বিষয় হলো আবির অনেক সুন্দর বাঁশি বাজায়। কাজের শেষে ক্লান্ত আবির প্রায় প্রতিদিনই বাঁশি বাজায়। বাঁশিতেই নাকি জীবনের গান। বাঁশিতেই নাকি তার বাঁচার প্রেরণা। আবির স্বপ্ন দেখে বড় হওয়ার। সুযোগ চায় এই ধোঁয়া আগুনের রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার। একটা মুক্ত পৃথিবী যেটা আবিরের স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। আবির স্বপ্ন দেখে বাবা মায়ের সাথে আবারো শৈশবটা কাটানোর। সে জানে যেটা আর কোনো দিনই সম্ভব নয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।