পুতুল তলিয়ে যাওয়ার আগে পরে

এদেশে যেন কোন কিছুরই গ্যারান্টি নেই । না চাকরির । না ভ্রমণের নিশ্চয়তার ।

দশ ফিট বাই আট ফিটের একটা ঘর। ঘরের ওয়ালের রং আর চাকলা উঠে জায়গায় জায়গায় ইট বেড়িয়ে গেছে। ধুলা ময়লা ভরা আর অগুছালো চারিদিক। উপরে অনেক পুরানা একটা নষ্ট ফ্যান ঝুলে আছে।

টেবিলের উপর পুরানা বই আর পেপারের স্তূপ আর একটা ভাঙ্গা টেবিল ফ্যানের ঘট ঘট আওয়াজ।
খাটে ময়লা বিছানা বালিশ। একটা ময়লা ছিঁড়া মশারী দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টাই ঝুলে থাকে।

এর মধ্যেই শুয়ে শুয়ে বই পড়েন আতিক সাহেব।

এই রুমটাই আতিক সাহেবের স্বর্গ। এই স্বর্গে তিনি নিজেকে কাটিয়ে দেন সাতটা বছর। বাথরুমের ফোঁটা ফোঁটা পানির শব্দ গুনতে গুনতে আতিক সাহেবের ঘুম আসে।

আজ আতিক সাহেবের ঘুম আসে না। এখন রাত তিনটা বাজে। ঘরে বিদ্যুৎ নাই। ভ্যাপসা গরমে আতিক সাহেবের গা ভিজে গেছে। সেই সাথে খিদাও লাগে।

খিদা লাগলেও করার কিছু নাই। ঘরে খাওয়ার মতো কিছুই নাই। সকালে বুয়া এসে রান্না করে দিয়ে যায়। আজ দুই দিন ধরে তাও আসে না।

আতিক সাহেবের একটা বাঁধা ধরা হোটেল আছে। গলির মাথায় মোবারকের হোটেল থেকে আতিক সাহেব নিয়মিত খেয়ে আসেন। আজ তিনি কিছুই খাননি।

ঘুম না আসার আরও কিছু কারণ আছে। কারণ আজ আতিক সাহেবের জন্মদিন।

জন্মদিনে আতিক সাহেব তিপ্পান্ন বছরে পা রাখেন। তার কাছে এখন জন্মদিন, ঈদের দিন, গুলি বিষাক্ত লাগে।

আতিক সাহেব একটা গ্রুপ অব কোম্পানির সিনিয়র একাউনণ্টেন অফিসার। অংক কষতে কষতে তার এতোটা বছর যায়।

তিনি নিজের জীবনের অংকের হিসাব মিলাতে পারে না। অংকের ভুলটা কোথায় আজো তিনি খুঁজে পান না। আতিক সাহেব একটা সিগারেট ধরান।

-অ্যাঁই শুনছো, কেকের অর্ডার কিন্তু বড় দেখে দিবা?

-এতো বড় কেক দিয়ে কি হবে?

-কি বলো এসব? বিয়ের পর তোমার প্রথম জন্ম দিন। খালা চাচা ফুপি মামা সবাই আসবেন। আত্মীয় স্বজনের কাছে মুখ দেখানো যাবে?

-ঠিক আছে বাবা আনবো।

-আর শুনো, আমি যা যা লিখে দিয়েছি, সব আনবা। কোন কিছু যেন বাদ না যায়।

-তুমি কলা লিখনি?

-না। জন্ম দিনের অনুষ্ঠানে কলা দিয়ে কি করবা?

-কলা ছাড়া আবার জন্ম দিন হয় নাকি? কলা মাস্ট, সাথে মনসুর। কেকের পর কলা। তারপর মনসুর মিষ্টি। সবাই কামড়িয়ে কামড়িয়ে খাবে। কড়কড় করে শব্দ হবে। আর মনসুর ছিটে তোমার কার্পেটের উপর পড়বে।

-ফাজলামো করো নাতো আতিক। দুইটা বেজে গেছে। আমাকে আবার রান্না করতে হবে। বিকালে সবাই চলে আসবে। যাও তাড়াতাড়ি।

-ঠিক আছে তুলি যাচ্ছি।

-আর শুনো। কেকের উপর ”হ্যাপি বার্থ ডে টু আতিক” এই টা লিখাবা না।

-তো কি লিখবো?

-বাজারের লিস্টের পিছনে লিখে দিয়েছি। পড়ে দেখো। বাংলায় লিখে আনবা।

”তুলি’র সাথে আমার প্রথম জন্ম দিন”

জীবনের নয়টা বছর তুলি’র সাথে আতিক সাহেবের জন্ম দিন হয়। সেই সব সুখের দিন আতিক সাহেবের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। যা আর কোন দিনও আসবে না।

আজ সাতটা বছর ধরে আতিক সাহেবের কোন জন্ম দিন, ঈদের দিন হয় না। অনেক জন্ম দিনে, ঈদের দিনে আতিক সাহেব না খেয়েই কাটিয়ে দেন সারাটা দিন, যেমন আজ।

ষোল বছর আগে তুলি’র সাথে আতিক সাহেবের বিয়ে হয়। বিয়ের ছয় বছর পর একটা মেয়ে।

মেয়ের নাম পুতুল। পুতুলের সাথে খেলা করেই তুলি আর আতিক সাহেবের সুখের দিন গুলি কেটে যায়।

-অ্যাঁই সবকিছু ঠিক মতো নিয়েছো তো?

-হাঁ, দুইটা ল্যেগেজ আর এই ব্যাগ টা।

-উউফফ, বাড়ী যাওয়া যে কি ঝক্কি ঝামেলা, আর ভালো লাগে না।

-অ্যাঁই শুনো, পুতুলকে একটু কোলে নাও তো। বৃষ্টি টা যে কখন ছাড়বে আল্লাই জানে। সেই সকাল থেকে আঠার মতো লেগে গেছে। তাঁর উপর আবার ঠাণ্ডা বাতাস।

-হুম, একটা বিষয় লক্ষ্য করেছো? প্রত্যেকটা ঈদের দিন বৃষ্টি হবেই। বহু বছর হলো আমি কোন ঈদের দিন বৃষ্টি ছাড়া পাইনি। এবার তো রীতিমতো ঝড়।

-অ্যাঁই শুনো, ব্যাগ লেগেজের দিকে সব সময় চোখ রাখবা। চারিদিকে চোর ছ্যাঁচোরে ভরা। লঞ্চ কখন ছাড়বে একটু খোঁজ নাও তো। দুই ঘণ্টা আগে ছাড়ার কথা। এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

আতিক সাহেব তুলি আর পুতুলকে কে নিয়ে কোরবানি ঈদের ছুটিতে বাড়ী যাচ্ছেন। আতিক সাহেবের বাড়ী বরিশাল ভোলা।

লঞ্চ ছাড়ার কথা বিকাল চার টায়। সেই লঞ্চ ছাড়ে রাত আটটায়।

লঞ্চে মানুষে গিজ গিজ করে। এর উপর বৃষ্টি আর ঝড়। তুলি পুতুলকে নিয়ে লঞ্চের কেবিনে বসে থাকে। ঘুমে তুলির চোখ লেগে আসে।

এখন রাত দুইটা বাজে। প্রচণ্ড বাতাসের শো শো শব্দ। সেই সাথে নদীর উত্তাল ঢেউ। লঞ্চ ডানে বামে দুলে।

হটাৎ চারিদিকে চিৎকার চেঁচামিচি। তুলি ভয় পেয়ে যায়। আতিক সাহেব বাইরে বেড়িয়ে দেখেন প্রতেকটা মানুষ ভয়ে আতংকে মুখ শুকিয়ে গেছে।

যে যার মতো শক্ত কিছু ধরে বসে আছে। কিছু মানুষ লঞ্চের লোকদের সাথে ঝগড়া করে। লঞ্চ পাড়ে ভিড়ানোর জন্য।

সারেং পাড়ে ভিড়াতে চায় না। তারা সকালের আগেই ভোলা যাবে।

ভার্সিটির কিছু ছাত্র লঞ্চের লোকদের ধরে মারে। সেই সাথে সারেং কেও হুমকি দেয়। সারেং বাধ্য হয় লঞ্চ নদীর পাড়ে নিতে। কিন্তু মাঝ নদী থেকে নদীর পার অনেক দূরে।

চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর থেকে থেকে মেঘের গর্জন। মেঘ চমকানির আলোতে নদীর পাড় দেখা যায় না।

এদিকে প্রচণ্ড ঢেউয়ের ধাক্কায় লঞ্চের নিচে তলায় পানি ঢুকে। নিচের মানুষ গুলি উপরে উঠে আসতে থাকে। লঞ্চ ব্যাল্যান্স পায় না। ডানে বামে প্রচণ্ড দুলতে থাকে।

মানুষ জনের চিৎকার চেঁচামিচি। কেউ কেউ জোরে জোরে দোয়া দরুদ পড়তে থাকেন। আতিক সাহেব তুলির হাত চেপে ধরে রাখেন। তুলি পুতুলকে কোলে চেপে দোয়া দরুদ পরেন।

বারোশ ধারণ ক্ষমতার লঞ্চে প্রায় তিন হাজারের উপর মানুষ। লাইফ সাপোর্টের কিছু নাই। কোন নিয়ম কানুনের বালাই নেই ।

লাইফ জ্যাকেট কি জিনিস লঞ্চের মানুষরা জানে না। ত্রিশ চল্লিশটা ভাংগা বয়া আছে তাও দড়ি দিয়ে বাঁধা।

সারেংরা লঞ্চের গতি কমিয়ে কন্ট্রোলে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু ঝড়ের সাথে কেউ পেরে উঠে না। লঞ্চের ঐ মাথা থেকে প্রচণ্ড চিৎকার চেঁচামিচি। লঞ্চের ডেকের উপর থেকে কিছু মালপত্র আর দুই তিন জন মানুষ পানিতে পড়ে যায়।

লঞ্চ এক সাইডে প্রচণ্ড কাঁত হয়ে গেছে। নিচ তলায় পানি ঢুকতে থাকে। লঞ্চ আর সোজা হয় না। উপুড় হয়ে পড়ে যায়।

লঞ্চ পানিতে ডুবে যেতে থাকে।

এরপর আতিক সাহেবের আর কিছু মনে নাই। শুধু এতটুকু মনে আছে, আতিক সাহেব তুলির হাত শক্ত করে ধরে ছিলো। কিসের যেন বাড়ি লেগে তুলি ছুটে যায়।

মেঘের প্রচণ্ড গর্জন আর ঝড়ো বাতাস, বড় বড় ঢেউ আর বৃষ্টি, চারিদিকে বিৎঘুটে অন্ধকার আর মেঘের চমকানি। এর সাথেই সবাই বাঁচার জন্য লড়াই করে।

আতিক সাহেবের যখন জ্ঞান ফিরে। তখন নিজেকে আবিষ্কার করেন অচেনা এক জায়গায় নদীর পাড়ে। চারিদিকে অনেক মানুষ, পুলিশ, সাংবাদিক, ফায়ার সার্ভিস, নৌ বাহিনী, সেনা বাহিনীর লোক জন।

আতিক সাহেব তুলি আর পুতুল বলে চিৎকার করতে থাকেন।

পরদিন দেশের সব গুলি মিডিয়ায় হেড লাইন হয়। ভয়াবহ লঞ্চ ডুবিতে দেড় হাজার মানুষ নিখোঁজ। তিনশো টি মৃত দেহ উদ্ধার। ধারণ ক্ষমটার অতিরিক্ত যাত্রী বহন।

তিনশো টি মৃত দেহের মধ্যে আতিক সাহেব তুলিকে খুঁজে পান। কিন্তু পুতুলকে পাওয়া যায় না।

আতিক সাহেব দিন রাত নদীর পাড়েই বসে থাকেন। সাথে তার কাছের মানুষ গুলি এসে যোগ দেন।

ঘটনার দুই দিন পর হাজার ফুট পানির নিচে থেকে লঞ্চ তোলা হয়। আরও অনেক মৃত দেহ। কিন্তু পুতুল নাই।

ঈদের দিন। লঞ্চ ডুবির তৃতীয়  দিন।

ঘটনার দেড় কিলো মিটার দূরে ভাসমান অবস্থায় নৌ বাহিনির লোক জন পুতুলকে উদ্ধার করে আতিক সাহেবের কোলে তুলে দেন।

আতিক সাহেব পুতুলকে কোলে নিয়ে আবার জ্ঞান হারান.।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।