পুরো শহরটাই যেন পাবলিক টয়লেট

This slideshow requires JavaScript.

বিশ্বের বুকে অন্যতম জনবহুল শহর ঢাকা। ঢাকা শহরে নানা কাজে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষকে রাস্্তায় চলাচল করতে হয়। অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, মিল-কল-কারখানা ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গে মানুষকে সকাল থেকে রাত অবধি রাস্তায় অবস্থান করতে হয়। এই বিপুল সংখ্যক নাগরিকের জন্য নেই পর্যাপ্ত টয়লেট ব্যবস্থা। সকালে অফিস সময় থেকে শুরু হয় অসহনীয় যানজট– সমস্ত শহর জুড়ে। এই যানজটে পড়ে দীর্ঘসময় আটকে থাকার সময় বয়স্ক মানুষ, নারী ও শিশুদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। পাবলিক টয়লেটের অপ্রতুলতা এই দুর্ভোগকে আরও কিছুটা বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে নারীদের জন্য এটি একটি ভয়াবহ সমস্যা।

রাজধানীর ফার্মগেট, শাহবাগ, মতিঝিল, কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি, আজিমপুর, মোহাম্মদপুর, টেকনিক্যাল, গাবতলী, উত্তরা, মহাখালীসহ অন্যান্য স্থানে সরেজমিনে ঘুরে পাবলিক টয়লেটের অপ্রতুলতার বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে আসে। পাবলিক টয়লেট না থাকায় যে কোন দেয়ালের পাশে এবং উন্মুক্ত সব স্থানে মানুষজনকে মলমুত্র ত্যাগ করতে দেখা যায়। ঝাঁঝালো দুর্গন্ধে নাকে কাপড় চেপে মানুষকে হাঁটাচলা করতে হয়। খোদ সংসদ ভবনের সামনে ও এর আশেপাশের এলাকাতেও হরহামেশাই মানুষ মলমূত্র ত্যাগ করছে।

ঢাকা শহরে বসবাস করা মানুষের সাথে প্রতিদিন আরো যোগ হয় বাইরে থেকে আসা বিপুল সংখ্যক মানুষ। আরো আছে ভাসমান জনগোষ্ঠি। তাদের সংখ্যাও কম নয়। ঢাকা শহরে এখন অনেক মহিলা চাকুরিজীবী রয়েছে। প্রতিদিন তাদেরকে চাকরির কারণে রাস্তায় বের হতে হয়। বাচ্চাদের নিয়মিত স্কুলে আনা নেওয়ার জন্যেও অনেক মাকে রাস্তায় বের হতে হয়। বেশিরভাগ মহিলাকেই অনেক দূর থেকে অফিসে বা স্কুলে যাতায়াত করতে হয়। পুরুষ মানুষরা সাধারণত যে কোন প্রকারে তাদের টয়লেটের প্রয়োজন মেটাতে পারে কিন্তু নারীদের জন্য সেই সুযোগ নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এহেন অবস্থায় বিশেষ করে মহিলাদের করণীয় কী? বিভিন্ন শ্রেণীপেশার কিছু মানুষের সাথে এ ব্যাপারে কথা বললে সকলেই এই সমস্যাটিকে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেন। দু’একটি এনজিও’র সহায়তায় কিছু মোবাইল টয়লেট শহরের বিভিন্ন স্থানে দেয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই নগণ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নিউমার্কেট, আসাদগেট, মতিঝিল, ফার্মগেট, মহাখালী, সংসদ ভবন সহ কয়েকটি এলাকায় গিয়ে দেখা যায় যে, সেসব এলাকায় কোন পাবলিক টয়লেট নেই। কোথাও কোথাও দুই একটি থাকলেও তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাছাড়া আশেপাশে কোন খোলা জায়গা না থাকায়, ফুটপাতে, দেয়ালের ধারে, এমনকি ফুটওভারের নিচে জনসমক্ষে যে কেউ মলমূত্র ত্যাগ করছে। নিউমার্কেট ফুটওভার ব্রিজের নিচের অবস্থা আরও ভয়াবহ। এখানে মানুষ কোন প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই জনসন্মুক্ষে প্রস্রাব করছে। এতে করে নারী, শিশুসহ যে কেউ বিব্রতকর পরিস্থিতির স্বীকার হচ্ছে। আবার সেখানে দুর্গন্ধে হাঁটাচলা করাও খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। বৃষ্টির দিনে অবস্থা আরও বেগতিক রূপ ধারণ করে সেখানে। অপরদিকে কেনাকাটাসহ নানা প্রয়োজনে বিপুল সংখ্যক নারীর যাতায়াত সেখানে। কিন্তু নারীদের জন্য প্রয়োজনে কাজ সারতে পারে এমন কোন ব্যবস্থাই সেখানে নেই, যা আসলেই দুঃখজনক। সেখানে কয়েকজন নারীর সাথে কথা বললে তারা বলে যে, ব্যাপারগুলো খারাপ দেখালেও পুরুষেরা তাদের প্রয়োজন যেখানে সেখানে সারতে পারছে। কিন্তু আমাদের জন্য সেই সুযোগটা নেই। সরকার যদি কিছু মোবাইল টয়লেটের ব্যবস্থা করে দেয় তবে এখানে আগত সকল নারীর জন্য খুবই ভাল হত। এটাতো শুধু নিউমার্কেট এলাকার চিত্র। রাজধানী ঢাকার প্রতিটি এলাকাতেই কমবেশি এই দৃশ্যচোখে পড়ার মত। নানা রকম আন্দোলন আর কর্মসূচি দিয়েও যত্রতত্র নোংরামি ঠেকানো যাচ্ছেনা।

খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকা- খাদ্য পুষ্টি ভবন পার হওয়ার কয়েকগজ দুরেই মূত্রের দূর্গন্ধযুক্ত পরিবেশের সন্ধানও আশা করি অনেকেই পেয়ে থাকবেন। কাজটি কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা করে না। করে রিকশাচালক বা এই শ্রেণির মানুষগুলো। ঢাকা শহরের অনেক এলাকাতেই ফুটপাথ দখল করে থাকে মুত্রের দূর্গন্ধযুক্ত তরল। পথচারী কখনো একটু বাঁকা হয়ে কখনো লম্ফ দিয়ে সেসব এলাকা পার হয়ে যাচ্ছে নাকে হাত চাপা দিয়ে। কখনো বা কখনো মনে মনে বা ফিসফিস করে গালিও দিচ্ছে অপকর্মকারীদের উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে নারীতো বটেই পুরুষও যত্রতত্র টয়লেটে যেতে পছন্দ করেন না। তারা ঘরের বাইরে গেলে পানি পান করেন না বা অনেকক্ষণ প্রশ্রাব চেপে রাখেন। যা শরীরের জন্যে খুবই ক্ষতিকর।

পুরো শহরজুড়ে এহেন অবস্থার জন্য প্রকৃত দায়ী কে বা কারা তা সুনির্দিষ্ট কিছু কারণও রয়েছে। তার মধ্যে, ঢাকা শহরের অপ্রতুল পাবলিক টয়লেট তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এটিই মূলত যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করার প্রধান কারণ। এই কারণে হাতের নাগালেই পাবলিক টয়লেট না থাকায় নিম্ন চাপের সম্মুখিন হলে তখন ফুটপাথই টয়লেটের অভাব পূরণ করে। তাছাড়া টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে আর্থিক অসঙ্গতি তো আছেই। ৫-১০ টাকা বাঁচাতেও হয়ত কেউ কেউ যত্রতত্র এই কাজগুলো করে থাকে। আবার পাবলিক টয়লেট যেগুলো আছে সেগুলোর অবস্থা এতটাই নোংরা যে, তা দেখেও অনেকে পাবলিক টয়লেট ব্যাবহার না করে খোলা জায়গা ব্যাবহার করে। অনেক সময় পাবলিক টয়লেটের সামনে লেগে থাকা লম্বা লাইন দেখেও অনেকেই নিরুৎসাহিত হন।

সরকারী উদ্যোগে যেন মানসম্মত পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়, আর চলার পথে বিশেষ করে নারীদের জন্য যেন কিছু মোবাইল টয়লেটের ব্যবস্থা করে দেয়া হয় এটাই সকলের প্রত্যাশা। তাছাড়া যে কয়টি পাবলিক টয়লেট বর্তমানে রয়েছে সেগুলোকে মানসম্মত করে গড়ে তোলার পাশাপাশি নতুন করে আর কিছু টয়লেট নির্মাণ করা খুব জরুরী। এতে করে জনদুর্ভোগ অনেকাংশেই কমে যাবে। পাশাপাশি শহরটাও খুব সুন্দর হয়ে যাবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।