ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না

প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্যকে কে না ভালবাসে ? ইট -পাথরের শহর থেকে নাগরিক ব্যস্ততার অবসরে মানুষ ছুটে যায় প্রকৃতিরই কাছে । প্রকৃতি যদি ফুলের সমাহারে পরিবেষ্টিত হয় তবে তো কথাই নেই । যেন ফুলের গন্ধে ঘুম আসবে না ।এমন  এক সৌন্দর্যমন্ডিত নানা রঙের রংধনুর মত চাদর বিছানো মাঠের নাম গদখালির পানিসারা গ্রাম।

যা ফুলের রাজধানি বা ফুলের স্বর্গরাজ্য  হিসেবেই পরিচিত।তবে তা সখের বসে তৈরি করা বাসা বাড়ির আঙ্গিনার ফুলের বাগান নয়। না অন্য কোন দেশে নয়(কাশ্মীরের টিঊলিইপ বাগান নয়) আমাদের এই ছোট দেশেই অবস্থিত।যশোর শহর থেকে প্রায় ২৫-৩০কিঃমিঃ দুরে অবস্থিত দক্ষিণ-পশ্চিমে্র দুটি থানা ঝিকরগাছা ও শার্শা। এ দুটি থানার ৬টি ইউনিওনের ৯০টি গ্রামের প্রায় ৪হাজার বিঘা জমিতে এই ফুলের চাষ।মাঠের পর মাঠ যতদুর চোখ যাবে দিগন্তের সাথে মিশে যাবে ফুলের সমারোহ।লাল,নীল,হলুদ্‌,গোলাপী,কমলা সাদা নানা রঙের ফুলের মাঝে মাঝে উঁকি দিতে থাকবে সবুজ ঝাউ গাছ।কয়েক রকম গাঁদা,লাল গোলাপ,রজনীগন্ধা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা,জিপসি ব্যাস্ত থাকে আশে পাশে মিষ্টি সুবাস বিলিয়ে দিতে।শুধু তাই নয় সাথে আরো থাকে গ্লাডিওলাস ও জারবেরার নানা রং ঢং দিয়ে দৃষ্টি কাড়ার দৌরাত্ন।জার্বেরার জন্য রয়েছে ছোট ছোট গ্রীন হাউস।যেখানে যত্ন সহকারে চাষিরা জার্বেরাকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে থাকেন।সেই গ্রীন হাউসের মধ্য নজরকাড়া সারি সারি বিভিন্ন রঙের জারবেরা।।

 

মাঝে মাঝে ঝাউ গাছের সারি যেন হাতছানি দেয় আরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার।বিস্তৃত মাঠে গোলাপের মাথায় পরানো ক্যাপ দেখলে মনে হবে যেন সবুজের মাঝে লাল কারুকার্য করা গালিচা।ফুলে ফুলে সময়মত এসে হাজির মৌমাছি মশাই।তাদের গুঞ্জনে ভোরে উঠে মাঠ।নানা রঙের ফুলের মাঝে প্রজাপতিও তার নানা  রঙের পাখা মেলে ঘুরে বেড়ায় তাদের রাজ্য।বিকেল বেলায় ঝুড়ি নিয়ে কৃষাণ-কৃষাণী ব্যাস্ত থাকেন ফুল তুলতে।মাঠ হতে কেটে কেটে গ্লাডিওলাসের তোড়া মাথায় করে নিয়ে যেতে ব্যাস্ত থাকেন কেউ কেউ ।ছোট ছোট পাইকার  ব্যাবসায়ীরা ফুল কিনে সাইকেলে  করে নিয়ে যান গন্তুব্য স্থানে।দেশের বিভিন্ন যায়গায় রপ্তানির জন্য ও জমা হয় ফুলের স্তূপ।এভাবেই মাঠ হতে কৃষান-কৃষাণীর হাত হয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পৌছে যায় গদখালির ফুল গুলো ।

দেশের প্রায় ৭০-৭৫% ফুল এখান থেক্কেই রপ্তানি হুয়ে থাকে।বিশেষ করে পহেলা বৈশাখ, ২১শে ফেব্রুয়ারি,২৬শে মার্চ,১৬ই ডিসেম্বর,বিভিন্ন ধর্ম্মীয় অনুষ্ঠান, বিয়ের লুগ্নের সময় সব চেয়ে বেশি ফুল বিক্রি হয়ে থাকে।তাই ফুল বাগানের অপরূপ যৌবন অবলোকন করতে হলে বিশেষ দিন গুলোর ঠিক দুই-চার দিন আগে যেতে হয় সেখানে।

১৯৮৪সালে সর্ব প্রথম রজনীগন্ধা ফুল চাষ শুরু করেন শেরআলি নামের এক কৃষক।তার পর থেকেই অনেকে উৎসাহ হয়ে ফুল চাষের দিকে ধাবিত হতে থাকেন।এভাবেই এক,দুই, তিন বিঘা থেকে শুরু করে পুরা গ্রামেই ফুলের চাষ হচ্ছে।গদখালি গ্রামের প্রধান শস্যই এখন ফুল চাষ কারণ দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে এখানকার কৃষাণ-কৃষাণিরা তাদের আর্থিক যোগান দিয়ে ভাগ্য পরিবর্তন করে আসছেন।বর্তমানে ফুল চাষই এখানের প্রধান জীবীকার বাহন।তবে জানা যায় একসময় কৃষাণ-কৃষাণিরা তাদের ফুল উৎপাদনের সঠিক মূল্য না পাওয়ায় ফুল বিদ্রোহ করেন।তারা বাকিতে ফুল বিক্রি বন্ধ করে দেন।নগদ টাকার বিনিময়ে যা বিক্রি হুয় টা বাদে বেঁচে যাওয়া ফুল গুলো গদখালির  এক খালে ফেলে দিত।প্রায় এক বছর চলেছিল এমন বিদ্রোহ।এভাবে তারা মহাজনদের বাকীতে ফুল কিনে তাদের পাওনা ঠিক মত না বুঝিয়ে দেয়ার মত অভ্যাসের পরিবর্তন্ করেছিল।তারা গড়ে তুলেছে ফুল চাষি কল্যাণ সমিতি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।