‘ভারতীয় চ্যানেলগুলা দেশটারে খাইছে’

লঞ্চের ইঞ্জিনের শব্দে কথা ভালো শোনা যাচ্ছে না। দোতলা থেকে নিচ তলায় নামি।  একজন লোক খুব জোরে জোরে কথা বলছেন।তার পাশে গিয়ে শোনার চেষ্টা চালাই। করলাম। লোকটার পরনে পাঞ্জাবি মাথায় টুপি।

পাশের এক চাচাকে বলছে, ‘বাড়ি টিভি আছে ?’

‘হ্যাঁ।’

‘বাসায় দেখে কি? নিশ্চয়ই স্টার জলছা্। আর আপনার সঙ্গে ঝগড়া করে!’

লোকটা বলে ওঠেন, ‘কি আর কমু, যুগই এখন জলছার্। কার কথা কে হোনে? তাগো দ্যাহার তারা দ্যাহে। কি আর কমু!’

এবার আমি পাশে দাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলাম কি বই বিক্রি করেন? বললো ধর্মীয় বই, শিশুদের বই, গল্পের বই। ক্রেতা ভেবে তার কথায় ফিরে গেল লোকটি।

Exif_JPEG_420

‘এইসব ভারতীয় চ্যানেলগুলো দেশটারে খাইছে। ঘরের মহিলারা খালি কাম-কাইজ রাইখা হারাডা দিন টিভির সামনে বইসা থাকে। আর ঝগড়া শিখে, ক্যামনে স্বামীর মুখে মুখে কথা কওয়া যায়। আমাদের দেশের মোশাররফ করিম, সাব্বির ওরা কত সুন্দর নাটক করে। দেখলে মনডাও ভালো হয়। শিক্ষনিও আছে।

লোকটির প্রতি কৌতুহল বাড়ে। জিজ্ঞেস করলাম তার নাম। পারভেজ । বাড়ি বরিশাল বেলতলা। লঞ্চে লঞ্চে প্রতিদিন বই বিক্রি করেন। সঙ্গে বাসের টিকিটও। আজ যে লঞ্চের বিক্রেতা তিনি সেটির নাম এম ভি পারিজাত। বিশাল সব নদী পার হয়ে বরিশাল থেকে মেহেন্দীগঞ্জ হয়ে লঞ্চটি লক্ষ্মীপুর যায়। যেসব যাত্রীরা লক্ষীপুর হয়ে চট্টগ্রাম যায় তাদের কাছে তিনি চট্টগ্রামের গাড়ির টিকিট বিক্রি করেন। বই আর টিকিট বিক্রি করেই তার সংসার চলে।

‘এইসব ভারতীয় চ্যানেলগুলো দেশটারে খাইছে। ঘরের মহিলারা খালি কাম-কাইজ রাইখা হারাডা দিন টিভির সামনে বইসা থাকে। আর ঝগড়া শিখে, ক্যামনে স্বামীর মুখে মুখে কথা কওয়া যায়। আমাদের দেশের মোশাররফ করিম, সাব্বির ওরা কত সুন্দর নাটক করে। দেখলে মনডাও ভালো হয়। শিক্ষনিও আছে।

পারিজাত এর মানে জানেন? চমকে দিয়ে বলে ওঠেন, ‘জানবনা কেন? শিউলি ফুল।’ আরো বলেন, বই বিক্রি করতে গিয়া অনেক বই আমারও পড়া হয়া গেছে।দশ বছর ধইরা বই বিক্রি করি। কম সময় তো না!’

তাকে বলি, ‘অন্য কাজও তো করতে পারতেন। বিই বিক্রি কেন? এতে পোষায়?’ তিনি সোজ, না পোষাইলে কি আর দশ বছর কাটাইতাম এক কাজে। বই আর টিকেট বেঁচে চলে যায়। আর অন্য কামের কথা বললেনা, এই কামে আর যাই হোক কেউ অসম্মান করেনা।’ তিনি আরো বলেন, ‘মানুষ বই না কিনলেও খারাপ কথা বলেনা। দুর দুর করে তাড়ায়না। মানুষ বই না কিনলেও হাতে নিয়ে দেখে দু্ই লাইন পড়ে আবার রেখে দেয়।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।