মন্দিরা গ্রামে নেমে এলো পরী

কালো রংয়ের এন সিরিজের একটা নতুন চকচক করা বি এম ডাব্লিউ গ্রামের পথ ধরে আস্তে আস্তে চলে আর কি যেন খোঁজ করতে করতে যায়। বয়স্ক মানুষ দেখলেই কিছুক্ষন পর পরই কালো কাঁচ নামিয়ে গাড়ীর ড্রাইভার কি যেন জানতে চায়।

রংপুর জেলার সদর উপজেলার মন্দিরা গ্রাম। ছেলে বৃদ্ধ সবার দৃষ্টি একটা গাড়ীর দিকে। গ্রামের ছোট ছোট শিশুরা মুরগীর বাচ্চার মতো গাড়ীর পিছন পিছন ছুটছে। হাতে ছুয়ে খালি গা ঘষে গাড়ী দেখার স্বাধ উপভোগ করছে। এই গ্রামে এমন গাড়ী তারা জীবনেও দেখেনি। সাইকেল, রিক্সা ভ্যান বড় জোর ট্রাক্টর পর্যন্ত তাদের দৌড়।

কালো রংয়ের এন সিরিজের একটা নতুন চকচক করা বি এম ডাব্লিউ গ্রামের পথ ধরে আস্তে আস্তে চলে আর কি যেন খোঁজ করতে করতে যায়। বয়স্ক মানুষ দেখলেই কিছুক্ষন পর পরই কালো কাঁচ নামিয়ে গাড়ীর ড্রাইভার কি যেন জানতে চায়।

দোচালা একটা মাটির ঘর। ঘর দোচালা হলেও ভাংগা চুরার শেষ নেই। জং ধরে টিনের চালে বড় বড় ফুটা হয়ে ভেংগে পড়ছে। বাড়ীর খুঁটি গুলি ক্ষয় হতে হতে সরু হয়ে গেছে। একদিকে একটা রান্না ঘর। রান্নাঘরটা ছনের তৈরি, তাও ঝুলে পড়েছে। সামনে বড় উঠান। উঠানের মাঝক্ষানে একটা বিশাল জাম গাছ।

জাম গাছের নিচে একটা বিদেশী পরী এসে দাঁড়ায়। সে বাড়ীর চারিদিক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। তাকে ঘিরে গ্রামের বাচ্চারা বিদেশী পরীর দিকে তাকিয়ে থাকে। পরীর ড্রাইভার বাচ্চাদের তাড়িয়ে দিলেও কেউ কথা শুনে না। তাদের সংখ্যা বাড়তেই থাকে।

হাইহিলের সাথে একটা স্কিন টাইট জিন্স প্যান্ট, লাল ফতুয়া, চোখে সানগ্লাস, হাতে দামি ব্রেসলেট। বিদেশী পরীর বয়স সাতাইশ হবে, দুধ ফর্সা গায়ের রং। সে তাকিয়ে আছে মাটির বারান্দায় বসে থাকা বশির আলীর আর রান্না ঘর থেকে ছুটে আসা মরিয়ম বেগমের দিকে।

বশির আলীর বয়স ষাটের কোঠায় মরিয়ম পন্চাশ প্রায়। তারা উঠে এসে অবাক দৃষ্টিতে বিদেশী পরীর দিকে তাকিয়ে থাকে। বশির আলীর তিন ছেলে। সবাই বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা থাকে। বাপ মায়ের খবর কেউ নেয় না বল্লেই চলে।

বিদেশী পরী তার ড্রাইভারকে কি যেন বলে, ড্রাইভার গাড়ীর বনেট খুলে এক গাঁদা কাপড় চোপড়ের নতুন প্যাকেট আরো কি কি যেন এনে মাটির বারান্দায় রাখে।

বশির আলী মরিয়ম বেগম কিছুই বুঝতে পারেন না কি হচ্ছে এসব। বিদেশী পরী মরিয়ম বেগমের কাছে গিয়ে তার দুই হাত দুটো নিয়ে নিজের হাতে চেপে ধরে তাকিয়ে থাকে। বিদেশী পরীর দু চোখ গড়িয়ে ঝর ঝর করে পানি পড়তে থাকে। কারো মুখেই কোন কথা নাই।

বিদেশী পরীর স্হায়ী নিবাস ঢাকার গুলশান হলেও সে ছয়মাস বয়স থেকেই কানাডাতে বড় হয়, বাংলা ভাষা ঠিক মতো বলতে পারেনা। কোন রকম ভাংগা ভাংগা জানে। মরিয়ম বেগমের হাত দুটো সে ছাড়ে না, হাত দুটো ধরে রেখেই সে বাবার কথা গুলি মনে করতে থাকে।

-আজ কেমন আছো বাবা?

-ঐ একই অবস্হা। আমার মনে হচ্ছে বেশী দিন আর বাঁচবো নারে মা? তোর মা গত হয়েছে আজ সাত বছর হলো। আমি মরে গেলে তোকে দেখবে কে মা?

-আব্বু, এত টেনশন করো নাতো, আর এমন উল্টা পাল্টা কথা বলবা না।

-বলি কি আর স্বাধে? আজ দেড়টা মাস ধরে এই হাসপাতালের বেডে পড়ে আছি। কিছুই ভালো লাগে না, কতো কথাই মনে পড়ে যায়।

বিদেশী পরী নিজেও জানে তার বাবা রায়হান চৌধুরী বেশী দিন বাঁচবেন না। উনার ব্লাড ক্যানসার হয়েছে এবং বর্তমানে শেষ স্টেজে আছে, ডাক্তাররা ইতি মধ্যেই ডেথ লাইন দিয়ে দিয়েছেন।

বিদেশী পরী বাবার কাছে বসে মাথায় হাত ভুলাতে থাকে। রায়হান চৌধুরী বিদেশী পরীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় ধরে রাখেন।

-তুমি একটু ঘুমাতে চেষ্টা করো আব্বু।

-তোর চিন্তায় চিন্তায় ঘুম আসে নারে মা। মা রে, অনেক দিন ধরে তোকে একটা কথা বলবো বলবো করে ভাবছি, কিন্তু সাহস পাচ্ছি না মা।

-কি কথা আব্বু? মেয়ের সাথে কথা বলতে আবার সাহস লাগে নাকি। বলো কি বলতে চাও।

-মা রে, কথাটা তোকে বলাটা আমার জন্য জরুরী। না বলে আমি যে মরেও শান্তি পাবো না।

-আব্বু, এতো ভনিতা না করে বলে ফেলো তো।

-তোর নাম কি জানিস মা?

-হি হি হি, আব্বু তোমার কি মাথা নস্ট হয়ে গেছে। কি বলছো এসব? আমার নাম রেনেসাঁ চৌধুরী তুমি জানো না?

-জানি রে মা, সবই জানি। তোর মা শখ করে তোর নাম রেখেছিলো রেনেসাঁ চৌধুরী।

-হুম বুঝলাম, তো কি হয়েছে? তোমাদের মেয়ে, তোমরা যা ইচ্ছা নাম রাখতেই পারো আবার কাটতেই পারো। আব্বু একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো তো। আমি তোমার হাত পা টিপে দিচ্ছি।

-না রে মা, আমার কথাটা মনযোগ দিয়ে শুন। খুবই জরুরী কথা।

-বলো বাবা, শুনছি

-আজ থেকে আঠাশ বছর আগের কথা। আমরা তখন থাকতাম ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানে। সেখানে এখনো তোর নামে এক বিঘা জায়গায় উপর একটা বিশাল বাড়ী আছে। তোর মায়ের সাথে সেই বাড়িতেই আমার বিয়ে হয়ে।

-বিয়ের পর আমাদের কোন সন্তান হয় না। অনেক দেশী বিদেশী ডাক্তার কবিরাজ করেছি কোন লাভ হয়নি। একটা সন্তানের জন্য তোর মা ছটপট করতো। এভাবেই কেটে গেলো কয়েকটা বছর।

-তখন আমাদের বাড়িতে একজন কেয়ারটেকার ছিলো। খুবই বিশ্বস্ত আর খুবই ভালো মানুষ। তার নাম ছিলো বশির আলী। বশির আলী আর তার বৌ মরিয়ম বেগম আমাদের বাসাতেই থাকতো। মরিয়ম বেগম রান্না বান্না দেখাশোনার কাজ করতো। তোর কি মন খারাপ করছে মা?

-না বাবা, ভেরি ইন্টারেস্টিং, তুমি বলো আমি শুনছি।

-একদিকে আমরা একটা সন্তানের জন্য ছটপট করছি অন্য দিকে মরিয়মের পেটে সাত মাসের বাচ্চা।

মরিয়মের বাচ্চাটার জন্য তোর মায়ের মায়া হয়। খুব যত্ন নেয় মরিয়মের। তাকে নিয়মিত শহরের বড় বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। মরিয়মের পেটে কান পেতে বাচ্চার শব্দ শুনে। একদিন মরিয়মের সাথে তোর মা কথা বলছে, আমি পেপার পড়তে পড়তে শুনছিলাম।

-বাচ্চার নাম কি রাখবে মরিয়ম?

-আমরা গরিব মানুষ বেগম সাব। এটা আমাগো প্রথম সন্তান। বাচ্চার বাপে ঠিক করসে, যদি মাইয়া হয় তয় নাম রাখবো, রহিমুন্নেসা বেগম রহিমা।

-হুম খুব সুন্দর নাম। বশির আলীর পছন্দ আছে বলতে হয়। ছেলেও তো হতে পারে।

-না বেগম সাব, উনি কয় আমাগো প্রথম বাচ্চা মেয়ে হইবো। উনার খুব ইচ্ছা একটা মেয়ে হোক। আমারো তাই ইচ্ছা। দোয়া কইরেন বেগম সাব।

-মরিয়মের যখন বাচ্চা হওয়ার সময় হলো, তখন তোর মা তাকে শহরের সব থেকে দামি হাসপাতালে নিয়ে গেলো। মরিয়মকে সব সময় টেক কেয়ার করার জন্য বাঁধা ধরা একটা নার্স রেখে দিলো। সকাল বিকাল দুইবেলা করে মরিয়মের জন্য নিজে হাতে রান্না করে হাসপাতালে খাবার নিয়ে যায়। খুবই ভালো মহিলা ছিলো তোর মা। কেন যে আমার আগে আল্লাহ তোর মা কে নিয়ে নিলো…

– তারপর কি হলো বাবা বলে যাও।

-হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দু’দিন পরই মরিয়মের একটা খুব সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা হয়। বাচ্চাটাকে সারাক্ষন তোর মা ই কোলে কোলে নিয়ে বসে থাকে। পাঁচ দিন পর নতুন বাচ্চা নিয়ে হাসপাতাল থেকে মরিয়মকে বাসায় নিয়ে আসে। মরিয়মের বাচ্চার খুশীতে সেদিন তোর মা এক মন মিস্টি কিনে সবাইকে খাওয়ায়।

পরদিন রাত তিনটার দিকে মরিয়ম গরম পানির জন্য রান্না ঘর যেতে গিয়ে দেখে, তোর মা সোফায় বসে নতুন বাচ্চার জন্য নিজে হাতে কাঁথা শেলাই করছে। মরিয়ম ঘরে গিয়ে তার স্বামী বশির আলীকে নিয়ে বের হয়। বশির আলী আমার খোঁজ করলে তোর মা আমাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যায়। সেদিন রাতে আমার সামনে মরিয়ম তার ফুটফুটে বাচ্চাটা তোর মায়ের কোলে দিয়ে বলে,

-বেগম সাহেব, আমগো রহিমা আজ থেইক্কা আপনাগো সন্তান। আমগো রহিমাকে এক্কেবারে আপনাকে দিয়া দিলাম বেগম সাব। আজ থেইক্কা রহিমা আপনার সন্তান। আজ থেইক্কা রহিমার ভালো মন্দ সব আপনার হাতে।

প্রথমে আমরা কেউ কথাটা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। রহিমাকে কোলে নিয়ে মরিয়মকে জড়িয়ে ধরে সেদিন তোর মা অনেক কেঁদেছিলো।

এর বিনিময়ে বশির আলী কোন টাকা পয়সা বা কিছুই নিতে রাজী হয়নি। এর ছয় মাস পরই আমরা রহিমাকে নিয়ে কানাডা চলে আসি। আসার আগে তোর মা এক রকম জোর করেই মরিয়মের নামে রংপুরে দশ বিঘা জায়গা কিনে একটা টিনের বাড়ী করে দিয়ে আসে।

সে দিনের সেই রহিমাই আজকের আমার রেনেসাঁ, রেনেসাঁ চৌধুরী।

রেনেসাঁর চোখ ছল ছল করে উঠে। রায়হান চৌধুরী তার কথা চালিয়ে যেতে থাকে।

কানাডাতে আসার পর বশির আলীর সাথে কয়েক বছর ই মেইলে যোগাযোগ থাকলেও পরে ধীরে ধীরে তাও বন্ধ হয়ে যায়। খুবই ভালো মানুষ ছিলো বশির আলী আর মরিয়ম বেগম। এমন সরল আর ভালো মানুষ আমি জীবনে দেখিনি।

এই আঠাশ বছরে সময়ের অভাবেই হোক আর বিভিন্ন কারনেই হোক, বাংলাদেশ আর যাওয়া হয়ে উঠেনি।

শোন মা, আমি জানি আমি বেশীদিন বাঁচবো না। আমার মৃত্যুর পর তুই বাংলাদেশে যাবি। ঢাকায় তোর নিজের বাড়ীতে উঠবি। আমার ছোটবেলার বন্ধু তোর ফয়সাল আংকেলকে টাকা দিয়ে রেখেছি, তুই যাওয়ার আগেই সে তোর জন্য একটা দামি গাড়ী কিনে রাখবে। আর এই কাগজে বশির আলীর ঠিকানা লিখে রেখেছি, তুই তোর আসোল বাবা মার খোঁজ নিস মা। আমি জানি না তারা বেঁচে আছে না মারা গেছে।

রেনেসাঁর চোখ দিয়ে ফোটা ফোটা পানি পড়ে। সে কোন কথা বলে না। এর নয় দিনের মাথায় রেনেসাঁর বাবা রায়হান চৌধুরি মারা যান।

এতক্ষন মরিয়ম বেগমের দু’হাত চেপে ধরে বাবার কথাগুলি বিদেশী পরী মনে করে।

সে মরিয়ম বেগমকে জাপটে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে।

মরিয়ম বেগম বিদেশী পরীর কান্নার কারণ কিছুই বুঝতে পারেন না, তবে মরিয়ম বেগমের কাছে মনে হচ্ছে, বিদেশী পরীর শরীরের গন্ধ আর নি:শ্বাসের শব্দ তার খুব পরিচিত।

তিনি বিদেশী পরীর শরীরে তারই রক্তের ঝড় শুনতে পাচ্ছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।