মিজানের মধু’র জীবন ও খাঁটি মধু তত্ব

মধুময় তার প্রাত্যহিক জীবন । প্রতিদিন খোঁজ চলে মধু’র মৌচাকের। নিজের সঙ্গে নিজ জীবনের মধু প্রতিনিয়ত রচনা করে চলে বছর ৩৩ এর মিজান। কারো কথা রাখার অপেক্ষায় না থেকে সাগরেদকে নিয়ে  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরিচা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ আর টাঙ্গাইলের পথে প্রান্তরে-বাড়িতে জঙ্গলে খুঁজে নেন মৌচাক। চলে মধু আহরণ।

মাইলের পর মাইল হাটেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের মিজান। মধুর জন্য। পথে চলতে চলতে মানুষই সন্ধান দেয় মধু ভরা চাকের। তারপর সেখানে গিয়ে মধুর চাকের স্থানীয় মালিকের সঙ্গে অর্ধেক ভাগের চুক্তিতে ভাঙ্গেন চাক। প্রতিদিন গড়ে তিনটি চাক ভাঙ্গেন। চাক থেকে পাওয়া মধুতো বিক্রি হয়ই। মোম এবং মৌমাছির বাসাটি আলাদা ভাবে বিক্রি হয়। সব মিলে মাসে ১৮-২০ হাজার টাকা থাকে তার।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে দেখা মিজানের সঙ্গে। আলবিরুনি হলের মৌচাক কেটে মধু নিয়ে ফিরছিলেন। ‘মৌমাছির হুল খেতে হয়না?’ রসিক মিজান বলেন, ‘খাইনা আবার! তয় এখন অনেক হম। সয়া গেছে। আগে খাইলে অনেক কষ্ট হইত। হাসতে হাসতে সে বলে আগে মুরব্বীরা কইত কিছু লোকের মুখে মধু অন্তরে বিষ। আর আমার মৌ পোকগুলার মুখে মধু পিছে বিষ! ওই বিষ সহ্য কইরা মধু পাই দেইখা বিষরে আর বিষ মনে হয়না। মধু পাইতে গেলে বিষতো সহ্য করতেই হইব। মাঝে মইধ্যে বেশি হুল ফুটাইলে কয়েক ঘন্টার জ্বর আসে। নিজে নিজেই সাইরা যায় আবার।’

দুই বছর বয়সী ছেলে হৃদয় আর স্ত্রীকে নিয়ে মধুময় সংসার জীবন। একসময় হাড়িপাতিলের ব্যবসা করতেন। ১৬ বছর আগে তাজু ওস্তাদের সঙ্গে চলে আসেন ধামরাইয়ে। ৭ বছর ওস্তাদের সঙ্গে কাজ করে নিজে একা কাজ করছেন ৯ বছর ধরে। চার বছর ধরে আজহার নামে এক সাগরেদ তৈরী করেছেন। তিনি যেমন তার ওস্তাদের সঙ্গে কাজ শিখে নিজে কাজ করছেন্ তার সাগরেদও একদিন একা কাজ করবে বলে মনে করেন তিনি। মিজান বলেন, একা তো একদিন দাড়াইতে হয়্ আমার ওস্তাদরে আমি এখনও সব সময় ফোন দেই। বেশি কাজ থাকলে তারে কই। আবার হেও আমারে জানায়।

বাবা সুলেমান মিয়া আর মা জায়েদা বেগমের চার সন্তানের সবার বড় মিজান মধুওয়ালা। দুই বোনকে মধুর টাকায় বিয়ে দিয়েছেন। ছোট ভাই অনার্সে পড়ছে এই মধুর টাকাতেই। সন্তান হৃদয় যদি মধুর পেশায় আসতে চায় তাহলে দেবেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ততদিনে মধু চাক হওয়ার মত গাছ আর দেশে থাকব কিনা হেই ভয়ই লাগে। যেই হারে গাছ কাইটা ফেলতাছে মাইনষে সেই রকম গাছ তো লাগাইতে দেখিনা।ছেলেরে পড়াশোনা শিখামু। তারপর হ্যায় যা করে!

এবং মধুর খাটিত্ব : এক কেজি মধু কেনা হয় মিজানের কাছ থেকে। কিনতে গিয়ে তার কাছ থেকে শিখে নেই খাঁটি মধু চেনার তরিকা। তিন উপায়ে মধুর খাটিত্ব নিশ্চিত হওয়া যায় বলে তিনি জানান। হাতে কলমে পরীক্ষাও করেন। প্রথমত, খাটি মধুর ২ চামচ একটি স্বচ্ছ কাপে পূর্ণ পানিতে ঢাললে তা তলানিতে থাকবে। তবে ওপরের পানি মিষ্টি হবেনা। দ্বিতীয়ত, হাতের তালুতে একটু মধু আর চুন রাখলে তা এত গরম হবে যে ফেরে দিতে হবে। ভেজার মধু হলে চুনের সংস্পর্শে এসে জমাট বেঁধে যাবে। তৃতীয়ত, দেশলাই কাঠির বারুদ অংশ মধুতে ডুবিয়ে পরে আগুনে দিলে তা জ্বলে উঠবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।