মেইড ইন চায়না

চীন। আদরের ডাক চায়না । বিশাল বড় একটা দেশ। অনেক গুলি প্রদেশ। এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে যেতে হয় ট্রেনে বা বিমানে।

চীন। আদরের ডাক চায়না । বিশাল বড় একটা দেশ। অনেক গুলি প্রদেশ। এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে যেতে হয় ট্রেনে বা বিমানে।

ট্রেনে গেলে দুই থেকে চার দিন লাগে, আর বিমানে গেলে দুই তিন ঘণ্টা। জেসমিন আক্তার সিমু চায়না নিগবো প্রদেশ থেকে বিমানে এসে নামে সাংহাই।

সাংহাইতে সিমু দুই দিন থাকবে। এরপর সে আরও তিনটা প্রদেশে যাবে। গুয়াংজো, সিচুয়ান, তারপর সুয়ানতো।

সাংহাই এয়ারপোর্ট থেকে সিমুকে নিয়া যাওয়া হলো টেরি অয়াং অফিসে।

অফিসে এসে সিমু’র পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেছে। এমনিতেই সিমু’র খুব খিদা লেগেছে। তার উপর এরা ভুল প্রোডাকশন করে রেখেছে।

জেসমিন আক্তার সিমু গার্মেন্টস বিজনেস করে। চায়না থেকে ফেব্রিক্স, এক্সেসরিজ আমদানি করে সিমু’র ফ্যাক্টরিতে গার্মেন্টসে প্রোডাকশন হয়। তারপর সেই গার্মেন্টস চলে যায় ইউরোপ অ্যামেরিকা সহ বিভিন্ন দেশে।

চায়নাতে সিমু অনেক গুলি কাজ একসাথে নিয়ে আসে। আবার কবে আসা হয় তার ঠিক নাই।

এরা না পারে ইংলিশ না পারে বাংলা। সিমু ওদের বাংলায় গালি দেয়, তার পরো ওরা ইয়েস ইয়েস করে যায়। তখন সিমু’র আরও বেশী রাগ হয়। কি করে এই জাতি এতো উন্নত, জেসমিন আক্তার সিমু তার হিসাব খুজে পায় না।

আপাতত সে পেন্টন নাম্বারের সাথে প্রোডাকশনের কালার মিলায়, কালার আঠারো বিশ।

-তোমার নাম কি?

-আমার নাম পিংকি মেম।

-এই অর্ডারের আমি যে পেন্টন নাম্বার তোমাদের মেইল করেছি, সেই ফাইলটা আমাকে দেখাও।

-এই যে মেম

-রেড কালারের পেন্টন নাম্বার এইটা। তাই তো?

-ইয়েস মেম

-এর কোয়ানটিটি আশি হাজার মিটার, ঠিক আছে?

-ইয়েস মেম। মেম কফি পান করুন।

-কফি পড়ে। আগে দেখো। ফাজিল।

-ইয়েস মেম।

-এবার তোমাদের পেন্টন বুকটা আনো।

-ইয়েস মেম,

-ইয়েস মেম বলে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? হারামজাদা। প্লিজ গিভ মি ইয়োর পেন্টন বুক।

-ইয়েস মেম, কামিং।

-এই যে দেখো, আমি তোমাকে যে নাম্বার দিয়েছি তাঁর কালার এইটা। রাইট?

-ইয়েস মেম।

-তোমার প্রোডাকশন সোয়াসের সাথে এই কালার ঠিক আছে?

-ইয়েস মেম।

-হোয়াট?

-সরি মেম।

-তুমি আমাকে যে ল্যাপডিপ সোয়াস পাঠিয়েছো, এই যে এইটা। এইটা আমি তোমাকে এপ্রুভেল দিয়েছি। ঠিক আছে?

-ইয়েস মেম।

-তোমার ল্যাপডিপের সাথে কি তোমার প্রোডাকশন স্যাম্পুলের মিল আছে?

-ইয়েস মেম।

-হোয়াট? তোর কি মাথা খারাপ? ফাজিল।

-ইয়েস মেম।

-অই ফাজিল, তোর বসকে ডাক। অয়াং কৈ? আমি আর তোর মতো ছাগলের সাথে কথা বলবো না।

-ইয়েস মেম। এক মিনিট। আমার বয় ফ্রেন্ড ফোন দিয়েছে। আমি একটু রিসিভ করে নেই। প্লিজ মেম।

-ভাগ্যিস তুই চাইনিজ রে। তুই যদি বাংলাদেশী হতি রে, কানের নিচে এখন চার পাঁচটা শব্দ পেতি। হা রা ম জা দা।

-ইয়েস মেম। ছুটির পর আমার বয় ফ্রেন্ড আমাকে নিতে আসবে। তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো।

-অই বেকুব, তোর কি মাথা খারাপ? এতো বড় সমস্যা নিয়ে আমার মাথা ঘুরছে, আর তুই এগুলি কি কস?

-ইয়েস মেম। এখন আমাদের লাঞ্চ টাইম। তোমার জন্য লাঞ্চ আনা হয়েছে। আসো আমরা আগে লাঞ্চ করে নেই। তারপর মিটিং করা যাবে।

খিদাতে সিমু’র মাথা ঘুরছে। তার উপর ভুল প্রোডাকশন। সিমু’র টেনশন ধরে গেছে। সে এখন কি করবে? এদিকে শিপমেণ্ট টাইম নাকের ডগায়। এলসি অ্যামেনমেণ্ট করা সম্ভব না। সবার আগে সিমু’র খাওয়া দরকার। তারপর অন্য কিছু।

খাওয়ার টেবিল ভরা ডিশ। নিচের পক্ষে হলেও, পনেরো থেকে বিশটা আইটেম। ওরা সিমু’র জন্য খুব দামি দামি খাওয়ার আনে। কারণ সিমু ওদের নিয়মিত বায়ার।

প্রচণ্ড খিদার পেটে, সিমু’র সাদা ডাল ভাত খেতে ইচ্ছা করে। এখানে সে রকম কিছুই নাই।

যা আছে তা দেখে সিমু’র পেট থেকে বমি উপচে উঠে। সিমু কিছুই বলতে পারে না। সাপের ফ্রাই, পোকা ভাজি, শামুক সুপ, কচ্ছপের কারি, ব্যাং গ্রিল, নুডুলস উইথ পোক এই সব চাইনিজ দামি দামি খাবার।

-তোমাদের ওয়াশ রুমটা কোন দিকে?

-এই দিকে মেম।

জেসমিন আক্তার সিমু ওয়াশ রুমে গিয়ে বমি করে। আর মনে মনে ইচ্ছা মতো ওদের গালি দেয়।

একজন মানুষের যতটুকু সেন্স থাকা দরকার, ওদের তাও নাই। যদি থাকতো তাইলে একজন বিদেশী কি ধরনের খাওয়া লাইক করে, তা জেনে নিতো।

সিমু বুঝে পায় না, এই সব মোটা মাথা, কি করে সারা দুনিয়া হাতের মুঠোয় নিয়ে ব্যাবসা বাণিজ্য করে। সিমু ওয়াশ রুম থেকে বের হয়।

-তোমরা কিছু মনে করো না। তোমাদের এই সব দামি দামি খাবার আমি খেতে পারবো না। যদি সম্ভব হয়, ম্যাকডোনাল্ডে থেকে আমাকে একটা চিকেন বার্গার আর এক কাপ কফি এনে দাও।

-ইয়েস মেম। আমি তাইলে আমার বয় ফ্রেন্ডের জন্য এখান থেকে কিছু খাবার নিয়ে নিবো।

সিমু কোন কথা বলে না, তার মেজাজ এখন তিরিক্ষি। কারন ফ্রেব্রিক্স কালার আঠারো বিশ। বায়ার কোন অবস্থাতেই এই কালার মেনে নিবে না।

কালারের সাথে মিলিয়ে এক্সেসরিজ প্রোডাকশন হয়ে গেছে। আবার নতুন করে ফ্রেব্রিক্স প্রোডাকশন করতে গেলে, গার্মেন্টস প্রোডাকশন করে শিপমেণ্টের সময় পাওয়া যাবে না।

এলসির বিপরীতে এরই মধ্যে সে ব্যাংক লোণ তুলে খরচ করে ফেলেছে। তার মাথায় এখন পাহাড় সমান চিন্তা ভাবনা।

কফি খেতে খেতে সাত পাঁচ ভাবে। হটাৎ শিমুর মনে পড়ে যায় বাবাকে। বাবা মারা যাবার পর শিমুই এই বিজনেসের হাল ধরে। বাবা বলতেন,

-মা রে, বিজনেসে যখন সমস্যা হয়, তখন আমরা চট করে মাথা গরম করে ফেলি। এটা ঠিক না। অনেক রকম সমস্যা আসবে। খুবই ঠাণ্ডা মাথায়, সমস্যা সমাধানের অপশন গুলি খুঁজবে। যে অপশনটা ভালো মনে হয়, সেটাকে কাজে লাগাবে। দেখবে সমস্যা কেটে যাবে।

-হাই মেম, তুমি কেমন আছো? আমি সরি মেম, একটা ব্যাংক মিটিং ছিলো। তোমার খবর পেয়ে তাড়াতাড়ি চলে এসেছি।

-হ্যাঁ আমি ভালো। তুমি কেমন আছো?

-হ্যাঁ মেম ভালো। লাঞ্চ করেছো মেম?

-হ্যাঁ করেছি।

-অনেক দিন পর এলে।

-তা ঠিক, চলো অয়াং আমরা কাজে ফিরে যাই।

-হ্যাঁ চলো। তোমার ফেব্রিক্স তো প্রোডাকশন শেষ। ভেসেল বুকিং দেয়া হয়েছে। চার পাঁচ দিনের মধ্যে জাহাজীকরন হবে।

-কি বলছো এই সব? তোমার তো কালার ই মিলেনি।

-মেম, আমি সরি। পিংকি নতুন মেয়ে। এটাই তার ফার্স্ট জব। সে তোমাকে যে প্রোডাকশন স্যাম্পুল দেখিয়েছে। সেটা তোমার অর্ডার ছিল না।

তোমার অর্ডারের স্যাম্পুল আমি সাথে নিয়ে এসেছি। এই যে পেন্টন নাম্বার আর তোমার প্রডাকশন স্যাম্পুলের সাতে মিলিয়ে দেখো।

মুহূর্তে শিমুর আকাশ সমান রাগ হাওয়ায় উরে যায়। খুশীতে সে বলে উঠে,

-অয়াং

-বলো মেম

-পিংকি কে একটু ডাকবে

-হ্যাঁ আমি ডাকছি

-মেম আমাকে ডেকেছো?

-হ্যাঁ। চলো পিংকি। তোমার বয় ফ্রেন্ড সহ আজ আমরা সাংহাই পার্ল টাওয়ারে উঠি। টিকিট সহ রাতের ডিনার আমি করাবো। মানে সব খরচ আমার, তোমার বয় ফ্রেন্ড উপলক্ষ্যে।

-উউউফফফ মেম, তোমাকে একটা কিস করতে ইচ্ছে করছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।