যেখানে গাছের কদমছাট দেয় হরিণ

সুন্দরবন

খুলনা জেলার সুন্দরবন , যার সাথে কোন এলাকার বনের তুলনা হয় না। হবেই বা কেন , কারণ সে যে বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।সেখানে যতদূর চোখ যাবে দেখা যাবে নদীর কোল ঘেষে গড়ে উঠা সবুজের সমারোহ।তাছাড়া আরও দেখা মিলবে জলচর ও উভচর প্রাণীর দেখা।সাথে আরো থাকবে গা ছম ছম করা রোমাঞ্চকর অনুভূতি ও বনের মাঝে লুকিয়ে থাকা অজানা রহস্যর টান।ঘুরে বেড়ানোর জন্য সুন্দরবনের সকল এলাকাই আকর্ষণীয় তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে সর্বত্র ঘুরে বেড়ানো সম্ভব নয়।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই রাজ্যকে ঘুরে দেখার জন্য সেখানকার জাহাজগুলোতে ভেসে বেড়াতে হয় চার থেকে পাঁচ দিন।তবে বনের নির্দিষ্ঠ কিছু এলাকা দেখে ভ্রমণ এক বা দুই দিনে শেষ করা ও সম্ভব।জাহাজে ভেসে বেড়ানোর সময় আমরা দেখতে পাই নদীর তীরে গাছগুলোর পাতা খেয়ে সমান করে রেখেছে সেখানকার হরিণ।প্রথম দেখায় মনে হতে পারে হয়ত কেউ কাঁচি দিয়ে সমান করে কদমছাট কেটে রেখেছে তবে সামনে এগোতে থাকলে যখন দেখা মিলবে হরিণের পাল এসে সেগুলো তাদের উচ্চতা অনুসারে খেয়ে খেয়ে সমান করে যাচছে তখনই হবে এই কদমছাটের রহস্যর উদঘাটন।শুধু তাই নয় গাছের সাথে ঝুলে থাকা বানর,উড়ে যাওয়া রঙ্গিন রঙ্গিন পাখি,গাছের মোটা শিকড়ের সাথে পেচিয়ে থাকা সাপ,ওঁত পেতে থাকা কুমির ধীরে ধীরে সব কিছুই আমাদের যান্ত্রিক জীবনের সকল আওয়াজকে দমিয়ে তৈরী করে এক নতুন রাজ্য আমাদের প্রবেশ।সুন্দরবনে যাওয়ার জনা উল্লেখযোগ্য জায়গা হল হাড়বাড়িয়া,জামতলা,কচিখালি,কটকা বিচ,কটকা অভয়ারণ্য।হাড়বাড়িয়া সুন্দরবনের একটি অন্যতম পর্যটন স্থান।এখানে একটি ইকোটু্রিজম ও রয়েছে।হাড়বাড়িয়া ঢুকার সাথে সাথে একটি ছোট পুকুর চোখে পড়বে।অতঃপর বনবিভাগের অনুমতি কার্যক্রম শেষ হলে তারা সেখানে ভ্রমণের জন্য সাথে একজন নিরাপত্তারক্ষী প্রেরণ করে।তাই একটু ভেবে দেখুন কতটুকু নিরাপত্তা প্রয়োজন হলে সাথে গানম্যানের প্রয়োজন হতে পারে। লম্বা একটি সাঁকো দিয়ে হারবাড়িয়ার মোটামুটি অনেকাংশই ঘুরে দেখা যায়। সাঁকো দিয়ে ঘোরার সময় দেখা মিলতে পারে বাঘের পায়ের ছাপ তাই সবসময়ই চোখ-কান খোলা। অথবা হতে পারে মায়া হরিণের সাথে সাক্ষাৎ।সাঁকোর দুপাশের লম্বা লম্বা গাছের কারণে সেখানে সুর্যের আলো পড়া কষ্টকর তাই সবসময়ই থাকে স্যাঁতস্যাঁতে আর একটু পিচছিল।তাই ভ্রমণের জন্য এমন স্যান্ডেল নির্বাচন করা উচৎ যা পথিমধ্য যেন প্রতারণা না করে।এলোমেলো ভাবে বেড়ে উঠা পশুর গাছ,গেওয়া গাছ ও গোলপাতা গাছ দেখলে মনে হবে যেন তারা আপন রাজ্যর আসল দখলদার।মাঝে মাঝে চোখে পড়বে গোলপাতার সাথে গোল গোল বড় বড় গোলপাতার ফুল।সাঁকোর নিচে তাকালে দেখা যাবে অসংখ্যা শ্বাস মূল যা মাটি থেকে মাথা বের করে উঁকিঝুঁকি মারতে থাকবে।শ্বাস মূলের স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে ছোট ছোট কাকরাঁড় ছোটাছুটি ও তাদের তৈরি মাটির ছোট ছোট বলের দানা যে কাউকেই প্রথম দেখায় বাধ্য করবে দাঁড়িয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকার জন্য তবে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না কারণ আপনার দলের লোকজন ও নিরাপত্তারক্ষী থেকে আপনার দূরত্ব হয়ত বেড়ে যেতে পারে।তাই সব সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন একা না হয়ে যান।হাড়বাড়িয়া ঘুরতে সন্ধ্যা নেমে এলে ভ্রমণে যোগ হবে আর এক অপরূপ দৃশ্যর আগমন। হাড়বাড়িয়ার প্রবেশ পথের পুকুরের আশে পাশে থেকে দেখা যাবে দুরদুরান্তের আকাশের সাথে মিশে যাওয়া নদি।সাথে বড় জাহাজ ও ভেশে বেড়ানো কার্গো।জাহাজের  লাল,নীল, আলোগু নদীর পানিতে এমনভাবে প্রতিফলিত হতে থাকবে যেন নতুন কোন রঙ্গিন সুর ঢেউয়ের সাথে ভেসে বেড়াচছে।কটকা অভয়ারণ্য সুন্দরবনের আর একটি রাজ্যর নাম।ছোট একটি পুল পার করেই শত শত হরিণের পাল গুলোর সেখানকার গাছগুলোকে কদমছাট বানিয়ে দেওয়ার দৃশ্য দেখুতে খুব বেগ পেতে হবে না।তবে খুব আসতে আসতে নিরবে সেখানে হাঁটতে হবে তা না হলে হরিণ গুলো মানুষের আগমন টের পেলেই হাওয়া হতে শুরু করে।তবে সাথে বাইনোকুলার ত্থাকলে আরো ভালভাবে তাদের বিচরণ অবলোকন সম্ভব।তবে এমন দৃশ্য ফ্রেমবন্দি করতে খুব ভোরে আসতে হবে।খালে মধ্য ছোট বড় সাপ ও অবাধে সাঁতরে চলে যেতে পারে।তবে সেখানে বড় বড় উপড়ে পড়া গাছ গুলো প্রমাণ দিবে আইলার ধ্বংস লীলার।মনে করিয়ে দিবে সৃষ্টির শুরু থেকে কীভাবে এই গাছগুলোই পৃথিবীকে রক্ষা করেছে সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দানবের মত লড়াই করে।এই গাছগুলোর অবদানের কারণেই আমরা আজ কটকা নামের অভয়ারণ্যর সাথে পরিচিত হতে পারছি।কটকা থেকে ঘন্টাখানিক দূরত্বে অবস্থিত জামতলা বীচ।প্রবেশের শুরুতেই দেখা মিলবে একটি ওয়াচটাওয়ারের।এখানে উঠে প্রায় পুরা জামতলা এক নজরে দেখে ফেলা সম্ভব।ওয়াচ টাওয়ার থেকে নেমে টাইগার পয়েন্ট দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।লম্বা লম্বা ঘাসের উপর থেকে হেঁটে যাওয়ার সময় মনে পড়ে যেতে পারে কীভাবে ঘাসের ভিতরে বাঘ তার শিকার করার জন্য লুকিয়ে বসে থাকে।ভাগ্য ভালো হলে দেখা মিলে ও যেতে পারে বাঘ মামার।তবে ভয়ের কিছু নেই কারণ সামনে ও পিছনে সাথে গানম্যান থাকবেন ফাঁকা গুলি করে রাস্তা ক্লিয়্যার করার জন্য।তবে সাবধানে থাকা ভাল।বড় বড় গাছের সাথে ঝুলে  থাকা লম্বা ও পেঁচানো মোটা শিকড় যা দেখলে মনে পড়বে সিনেমার টারজান কীভাবে এক শিকড় ঝুলে অন্য প্রান্তে চলে যেত তবে শিকড়ের এমন প্যাঁচ দেখে সেই হিসাব আমি মিলাতে পারিনি।বিভিন্ন আকার আকৃতির ছোট বড় গাছের ঝোপ যেন এক অজানা রাজ্যর দিকে হাতছানি দিয়ে ডেকেই চলেছে।চলন্ত পথের ঘাসের মধ্য লাল,হলুদ,নীল রঙের ফুটে থাকা বুনো ফুল গুলোও কম যায়্ না।সাথে রঙ্গিন প্রজাপতি ও ফড়িং।এভাবে জামতলার সবুজ মাঠ পেরিয়ে দেখা মিলবে কটকা বীচের।যার প্রবেশ পথেই একটি সাইনবোর্ড টাঙ্গানো “কটকা একটি বিপদজনক সমুদ্র সৈকত” ।তবে ভ্রমণ পিপাসু মন কি ডরায় এমন সাইনবোর্ডে।কটকা বীচের জোয়ার-ভাটার কারণে এক এক সময়ে এক এক রকম অনুভূতির সৃষ্টি করে।তবে এখানকার বিধ্বস্ত গাছপালা গুলো আবার আইলার ধ্বংস যজ্ঞের প্রমান দিয়ে থাকে।কটকাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ের প্রামাণ্য চিত্র দেখে মনে হবে এ যেন এক প্রাকৃতিক মিউজিয়াম।সময়-সুযোগ থাকলে বীচে ডুব দিয়ে আসার লোভ সামলিয়ে আশা উচিৎ না।সুন্দরবনের আর এক অভয়ারণ্যর নাম কচিখালি।যেখানে দেখা মিলতে পারে হা করে ঘুমিয়ে থাকা কুমিরের।হরিণের পালের বা শুকরের যা এখানে পানি খেতে আসে।করমজল সুন্দরবনেরর আর একটি ভ্রমণ কেন্দ্র।সেখানে জাহাজ ভিড়া মাত্রই এসে স্বাগত জানাবে বানর মশাই যেন আপনার সাথে বহুদিনের পরিচয় তার চেয়ে বেশি আপনার খাবার ও জিনিসঅপত্রের সাথে।সেখানে রয়েছে কুমির প্রজনন কেন্দ্র। দুটি বয়স্ক কুমির ও রয়েছে যাদের নাম রোমিও ও জুলিয়েট।স্থানীয়দের ডাকে তারা সাড়া দিয়ে বেরিয়ে আসে।আশে পাশে ঘুরে বেড়ানো হরিণের সাথে ও দেখা মিলবে।তারা মানুষকে  মোটে ও ভয় পায় না।করমজলে ও ঠিক একইভাবে একটি সাঁকো দিয়ে পুরা এলাকা একটি ঘুরনা দিয়ে আশা যায়।সেখানেও রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার যার উপরে উঠে এলাকার অনেকাংশ এক নজরে দেখা সম্ভব।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।