শারীরিক প্রতিবন্ধকতার দোহাই নয়,চা বিক্রি করেই চলে শাহজাহানের দরিদ্র সংসার

‘আমার দুই পা অচল। তবু নিজেকে কখনো অসহায় মনে হয়নি। কারো কাছে কখনো হাত পাতিনি।নিজের জীবিকা নিজেই নির্বাহ করছি। সমাজের অন্য দশজনের চেয়ে বেশ ভালো আছি।

চা খায় না, এমন মানুষ খুব কমই আছে। চায়ের জনপ্রিয়তায় শহর থেকে প্রান্তিক জনপদে, আনাচে কানাচে গড়ে উঠেছে অসংখ্য চায়ের দোকান। আর সে চায়ের দোকান যদি হয় ভ্রাম্যমান তাহলে তো বাড়তি চমক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও রয়েছে তেমনি এক ভ্রাম্যমান চায়ের দোকান। যেটি তিন চাকার বিশেষ গাড়িতে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করে।

কখনো তিনি চা বিক্রি করেন কার্জন হল এলাকায়, কখনো শহীদ মিনার এলাকায়, কখনো টিএসসিতে, কখনো আবার সূর্যসেন, শহীদ জিয়া কিংবা মহসীন হল এলাকায়। তিন বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চা, সিগারেট, চিপস বিক্রি করছেন প্রতিবন্ধী শাহাজান (৩১)।পঙ্গু হওয়ায় হাঁটতে পারেন না, তিন চাকার গাড়িই চলাফেরার একমাত্র ভরসা। তবুও জীবন যুদ্ধে হার মানেননি তিনি। গাড়িতে ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করেন। সকাল ১১টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত তাকে দেখা যায় ক্যাম্পাসের নানা প্রান্তে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী রুবেল হাসান। শাহাজানের ভ্রাম্যমাণ চায়ের দোকানের নিয়মিত গ্রাহক। রুবেল হাসান বলেন, শাহাজাহান মামার রং চায়ের মজাই আলাদা। যে কারণে তাকে পেলে আগ্রহ নিয়ে তার চা পান করি।

শুধু রুবেল নন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থীর পছন্দ শাহাজান মামার রং চা। মূলত ঢাবির শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস এলাকার শ্রমজীবী মানুষগুলোই তার নিয়মিত গ্রাহক। এনায়েত উল্লাহ (৪০) দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে রিকশা চালান। তিনি জানান বছর খানেক হলো তিনি শাহাজানের ক্রেতা। তিনি বলেন, ‘চা খাইতে মন চাইলে উনাকে খুঁইজা বাইর করি ’

শাহাজান ২০০৯ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চা বিক্রি করছেন। রাতে থাকেন রাজধানীর সাতরোজা এলাকায়। এর আগে তিনি গ্রামে থাকতেন। শাহাজানের জন্ম চাঁদপুর জেলার হাজিগঞ্জ থানার উত্তর শ্রৗপুর গ্রামে। বাবা লতিফ জোয়ার্দার গাছ কাটার শ্রমিক। সাতভাই বোনের সংসারে শাহাজান চতুর্থ। তিনি জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী নন। অন্য দশটি স্বাভাবিক শিশুর মতোই জন্মেছেন তিনি। ছোটবেলায় হাঁটতে পারতেন। তিন বছর বয়সে টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হয়ে দুই পা অচল হয়ে যায়। সে অবস্থাতেই তিনি উত্তর শ্রীপুর শহীদস্মৃতি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণী পাস করেন। দারিদ্র্যতার কারণে আর পড়া হয়নি তার।

কিছু একটা করতে হবে, এমন ভাবনা থেকেই ২০০৮ সালে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়ে নিজ গ্রামে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান দেন তিনি। এক বছরের মাথায় গ্রাহকদের বাকি দিয়ে পুঁজি হারান। ২০০৯ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ছবির হাটে একটি চায়ের দোকানে তিনহাজার টাকা বেতনে কাজ শুরু করেন। কিন্তু মন মানছিল না। ভেবেছেন নিজেই কিছু একটা করবেন। সামান্য টাকা জমিয়ে ২০১১ সাল থেকে টিএসসি এলাকায় নিজেই পানি আর সিগারেট বিক্রি শুরু করেন।

২০১৫ সালে ১৫ হাজার টাকায় তিন চাকার গাড়ি তৈরি করে ৮ হাজার টাকার মালামাল নিয়ে শুরু করেন ভ্রাম্যমাণ চায়ের দোকান। শাহাজান জানান, চা  তিনি  নিজেই বাসায় তৈরি করে ফ্ল্যাক্সে নিয়ে আসেন। দোকানের অন্য মালামাল সংগ্রহ করেন আনন্দবাজার থেকে।প্রতিদিন দোকানে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা বিক্রি হয়। এই টাকা থেকে বাবা-মায়ের জন্য গ্রামে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা পাঠান। আলাপকালে শাহাজান বলেন, ‘আমার দুই পা অচল। তবু নিজেকে কখনো অসহায় মনে হয়নি। কারো কাছে কখনো হাত পাতিনি।নিজের জীবিকা নিজেই নির্বাহ করছি। সমাজের অন্য দশজনের চেয়ে বেশ ভালো আছি। ভবিষ্যতে স্থায়ী চায়ের দোকান দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

১৬/১১/১৭

ছাইফুল ইসলাম মাছুম

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।