সাবলম্বি নারী মনোয়ারা

আমাদের সমাজের আনাচে কানাচে এমন অনেক নারী আছেন যারা অর্থনৈতিকভাবে ব্যক্তি জীবনে সফল, এসব নারীরা কিন্তু পারিবারিকভাবে উত্তরাধিকারী সম্পদ কিংবা উচ্চ শিক্ষার সার্টিফিকেট নিয়ে সফল হননি তাদের সফলতার পিছনে যেটি ছিল তা হলো কঠোর পরিশ্রম আর দীর্ঘ ধৈর্য্যের একাগ্রতা। তেমনি একজন সফল নারী জাবি ক্যাম্পাসের মনোয়ারা বেগম। তিনি বটতলায় একটি বড় ভাতের হোটেলের মালিক, এবং সাত বছর যাবৎ তিনি একাই এ দোকান চালাচ্ছেন, যেখানে তিনি আরো দশ থেকে বারজন নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। এখানে প্রত্যেক কর্মচারীর বেতন ৪০০০ থেকে ৮০০০ টাকা। তার আজকের এই অবস্থানের পিছনে আছে দীর্ঘ ৩২ বছরের কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা।

মনোয়ারা বেগমের গ্রামের বাড়ি ছিল মানিকগঞ্জ জেলায় সেখানের তার স্বামীর ছিল অনেক জায়গা জমি ও সহায় সম্পত্তি। কিন্তু ভাগ্যের লীলা খেলায় সব কৃষিজমি নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যায়। উপায়ন্ত না পেয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে মনোয়ারা বেগম তার স্বামীকে নিয়ে তিন বাচ্চাসহ আশ্রয় নেন সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। উপরে খোলা আকাশ আর শতখানেক টাকাই ছিল তখন তাদের সম্বল, তার স্বামী তখন পিতৃ সম্পদ হারায় দিশেহারা। জীবনের এই কঠিন মুহুর্তে সংসারের হাল ধরেন মনোয়ারা, নিজে কিছু আটা কিনে পিঠা বানাতে বসেন বেগম ফয়জুন্নেছা হলের সামনে আর স্বামীকে পাঠান কাঁচামালের তরকারি নিয়ে বিক্রি করার জন্য। এভাবে তিন চার বছর চলার পর কিছু টাকা হাতে হয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু আবাসিক ছাত্র খালাকে বলে, খালা আমাদের জন্য ভাত রান্না করেন,তখন খালা পিঠা রেখে ভাত রান্না করা শুরু করেন এবং আস্তে আস্তে একটু বেঁচে থাকার আলো দেখতে পান, এবং সন্তানদের সামান্য পড়ালেখার জন্য স্কুলে পাঠান। এভাবে ১৫ -১৬ বছর যাওয়ার পর তিনি আরো কিছু টাকা পুজি করে বটতলায় আরো একটু বড় দোকান দেন এবং দু- চারজন কর্মচারী নেন। এবং তার সন্তানদের জন্য কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা করেন। এতদিনে তার প্রাণপ্রিয় স্বামী শারীরীকভাবে অসুস্থ হন এবং দু- তিন বছর পর মারা যান। এরপর আস্তে আস্তে তার দোকান আরো বড় হতে থাকে এবং স্বচ্ছলতার দিকে ফিরে যান।এভাবে তাকে আর কখনো টাকার জন্য পিছনে ফিরতে হয়নি । আজ বটতলার ৪০ টি দোকানের মধ্যে একমাত্র তিনিই একজন মহিলা একটি বড় দোকান পরিচালনা করছেন। এবং ক্যাম্পাসের সকলের কাছে বটতলার খালা হিসেবে পরিচিত। এরপর আরো কিছু টাকা জমানোর পর ক্যাম্পাসের পিছনে জায়গা রেখে ঘর উঠান। আজ তার ঘর আছে টাকা আছে কিন্তু এখন খাওয়ার কেউ নেই, কারন তিন ছেলে আর এক মেয়েকে বিয়ে করে আলাদা থাকে আর ছোট ছেলে মাঝে মাঝে তার কাছ থেকে টাকা নেয়।
বর্তমানে মনোয়ারার দোকানে বারজন নারী- পুরুষ কর্মকরে জীবন নির্বাহ করছে। নদী ভাঙ্গা সহায় সম্বলহীন নারী দীর্ঘ ৩২ বছরের কঠিন সাধনায় শুধু নিজে সাবলম্বি হননি বরং ছেলে মেয়েদের সুন্দর ব্যবস্থা করে আরো ১২ জন মানুষের কর্মসংস্থানেরর ব্যবস্থা করেছেন।
আজ আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার ছেলে অনার্স মাস্টার্স করে চাকরির জন্য হন্য হয়ে খুজছি অথচ আমাদের সামনেই একজন শুধু সাক্ষরতা সম্পন্ন নারী জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন কঠিন পরিশ্রম করে কোন কাজকে ঘৃণা না করে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।