সিলসিলা

সর্বসাধারণ

ট্রেন ছুটে চলেছে  চট্রগ্রামের দিকে । ঢাকা থেকে । আমার মুখোমুখি যিনি বসা তার পরণে লাল সালু’র কাপড় । সাধুদের মতোন । চুল জুটি বাঁধা । হাতে অনেক বালা । গলায় ও অনেক মালা ।

নাম কি ?

আমার প্রশ্নের জবাবে নির্বিকারভাবে জানালার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন , ” বায়োজিদ বোস্তামী।”

পরিচয় এভাবেই । যাত্রাপথে অামাদের কথা শুরু হয় । রাতের ট্রেন  । ঘুম আসছিল না দুজনেরই । বায়োজিদ বোস্তামী যাবেন কক্সবাজার । কোনদিন সমুদ্র দেখেন নি । মাজারে মাাজারে ঘুরে বেড়ান। কুষ্টিয়া , বাগেরহাট , সিলেট সব জায়গায় মাজারে গিয়েছেন কিন্তু কক্সবাজার কখনো যাননি । তার ধারণা নূহের প্লাবনের শুরু স্থল কক্সবাজার । তাই ওখানে মাজার থাকবই। না থাকলে মাজার করতে হবে ।

বায়োজিদ বোস্তামী ঘর ছাড়েন কত বছর বয়সে সেটি তার মনে নাই  । অাদি বাড়ি জামালপুরের সরিষাবাড়ির যমুনা নদীর তীরে পিংনা গ্রামে । এপারে সরিষাবাড়ি ওপাড়ে সিরাজগঞ্জ । নদীর মধ্যে অসংখ্য চর । সেইসব চর জেগে উঠলে নদীর বুকে নদী ভাঙা সব হারানো মানুষ চরে বসত গড়ে।  পিংনা গ্রামেরও একটা বড়ো অংশ ৮৮ সালের দিকে নদীগর্ভে তলিয়ে যায় । সেসময় বায়োজিদ বোস্তামী যমুনার উজানে চর বিলাসে এক পরিবারের সাথে ওঠেন। তখন তার বয়স কত ঠিক বলতে পারবেন না । এখন কত জানতে চাইলেও বলতে পারেন না  বলেন , “ বয়স দিয়া কি অয় ? দিন যায়, আন্ধার ডাকে ।”

তো , ওই যে ৮৭ সালে যমুনার উজানে চর বিলাস জেগে ওঠে ওসব চর দখল নিয়েও মারামারি হয়, সংঘর্ষ হয়, খুন হয়। অল্প জায়গা। ১০/১৫ ঘরের বাস। কে থাকবে কে থাকবে না এনিয়েও  স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনীকে টাকা দিতে হয় । নদী ভাঙা মানুষ চর জাগার খবর পেয়ে দেখা গেল অনেকদুর থেকে নদীর প্রবল স্রোতে সাঁতরিয়ে যেই চরে উঠতে চায় অমনি লাঠিয়াল বাহিনীর বাঁধা  । চাঁদা নিয়ে দরাদরি ।

সেই চর বিলাসে বায়োজিদ বোস্তামীর কাটে কিছুকাল । তার তো  সব মনে থাকে না , তাই বলতে পারেন না ঠিক কবে ওই চর বিলাস ছেড়ে নিরুদ্দেশ হন । তবে এটি মনে অাছে কোন এক অমাবস্যার রাতে বায়োজিদ বোস্তামীর ঘুম আসছিল না । চরের পাড়ে গিয়ে বসেছিলেন । নিথর নিরব চারপাশ । হাওয়া বয় যমুনার পানি থেকে ওঠে এসে যেন । দুরে লঞ্চের অালো, অারও দুরে ডিঙ্গি নৌকার কূপি জ্বলে । সেসময় চরের একটা নারিকেল গাছে এক শাদা অালখেল্লা পরিহিত মাওলানা গোছের একজনকে গাছ বেয়ে ওপরে উঠতে দেখেন । এরপরই ঘটে সেই রহস্যজনক ঘটনা । যেটির উত্তর অাজও পায়নি বায়োজিদ বোস্তামী । দেখেন , ওই মাওলানা একটা বোরাকেরআকৃতি ধারণ করে নদীর ওপর দিয়ে কোথায় ভেসে চলে যাচ্ছেন । অমাবস্যা রাতে তিনি এ দৃশ্য কিভাবে দেখলেন সে ও এক রহস্য ।

বায়োজিদ বোস্তামীর কি হয় সেদিন তিনি নিজেও জানেন না । নদী সাতরে সরিষাবাড়ী ঘাটে অাসেন। ওখান থেকে ভোর সাতটার ট্রেন ধরেন । ট্রেনের ছাদে বসেন । এরপর কিভাবে কিভাবে ঘুরতে ঘুরতে সিলেট যান । শাহজালাল ও শাহপরাণের মাজার জিয়ারত করেন । সেখান থেকে ট্রেনের ছাদে বসে আবার ঢাকা । সেখান থেকে লঞ্চে খুলনা । খুলনা থেকে ট্রেনের ছাদে করে কুষ্টিয়া।

এতদিন বায়োজিদ বোস্তামীর কেটেছে ওখানেই । সাধুসঙ্গে । ওখানেই যেসব মানুষের সাথে পরিচয় হয় এর মাঝে বেশিরভাগই উদ্বাস্তু । নদী ভাঙনের শিকার অনেকে । সবাই সাইজীর গান করেন । গোষ্ঠলীলা করেন । পরমকে পাওয়ার বাসনা  ।

জানতে চাই , “ অাপনদের মনে পড়ে না ? “

তিনি > না । জগতে কেবা অাপন কেবা পর ? অামি কি চিনি আমারে ?

এরপর গুনগুনিয়ে গান ধরলেন, “লালন মরল জল পিপাসায় থাকতে নদী মেঘনা । “

তার কন্ঠস্বর ভাল । এর মধ্যে আমরা ট্রেনের বুফেকারে ( যেখানে খাবার পাওয়া যায় ) গেলাম । কিছু খেলাম ।

ফিরে এসে বসলাম নিজ নিজ সিটে । তখন ভোরের অালো ফুটছে ।

জানতে চাইলাম  “কক্সবাজার কেন ? যদি মাজার না পান ?

আমার কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ তিনি । এরপর বললেন , “ নদী ভাঙনের শিকার অামি । চরে লাঠিয়াল । পানিতে অামি । সেই ঠাই পেলাম সাইজীর মাজারে । পরমরে খুঁজিরে বাবা পরমরে । “

বলি  “ কিন্তু কক্সবাজার কেন ?

বলেন “ সমুদ্র শুনছি মানুষের বসত ভাঙে না । সমুদ্র বিশাল । পরম  ।

এটুকু বলে একটু চুপ । তার চোখের কোণে পানি । বলেন , ” বাবারে অামার ক্যান্সার হইছে । টাকা নাই । সমুদ্রের ধারে মাজার খুঁজব । না পাইলে হাটতে হাটতে সমুদ্রের ভিতর দিয়া চইলা যাব।

কি বলেন এইসব ?

তিনি তাকান আমার দিকে ।

এরপর বললেন , “বুঝলে আমরা মায়ার সংসারে বাস করি । সমুদ্র পরম । পরমে ডুবে মরলে ক্ষতি নাই বাবা। “

সেই কবে বায়োজিদ বোস্তামীর সাথে দেখা । আজও মাঝে মাঝে চোখের সামনে একটা দৃশ্য এমন ভেসে ওঠে , বায়োজিদ পরমকে পেতে নদী ভাঙনের যন্ত্রণা ভুলতে, চিকিৎসা না করাতে পেরে কি আনন্দেই না সমু্দ্রের বিচ থেকে হাটা শুরু করেছেন । দর্শনার্থীরা দেখছেন এক লোক হেটে হেটে সমুদ্রের গভীরে মিশে যাচ্ছেন । নাই হয়ে যাচ্ছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।