সিলেটের কীন ব্রীজ ও ঠেলাদের গল্প

বিট্রিশ আমলে নির্মিত ব্রীজটি কেবল ঐতিহাসিক কারনেই বিখ্যাত নয়। বরং সাত যুগ ধরে কীন ব্রীজকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে বহু মানুষের জীবন। শুধুমাত্র কীন ব্রীজকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক অভিনব পেশা, স্থানীয় ভাষায় ঠেলা নামে পরিচিত।

সিলেট থেকে ঘুরে এসে:
উঁচুব্রিজ। দুপাশে জনা কয়েক মানুষের জটলা। যাত্রীবাহি রিক্সা, ভ্যান ব্রিজে উঠানো চালকের একার জন্য বেশ কষ্টকর। তাই কেউ কেউ স্বপ্রনোদিত হয়ে ঠেলে দিচ্ছে রিক্সা। ‍বিনিময়ে দাবি করছেন মজুরী। নতুন কেউ এই এলাকায় এলে প্রথমে হয়তো অবাক হবেন। বলছিলাম সিলেট কীন ব্রীজের কথা।
ব্রীজটির দৈর্ঘ্য ১১৫০ ফুট। প্রস্হ ১৮ ফুট। স্থাপত্যশৈলীর নান্দনিকতা কীন ব্রীজকে করেছে আকর্ষনীয়। সময়ের পরিবর্তনে কীন ব্রীজ হয়ে উঠেছে সিলেট নগরীর ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বয়স বেড়েছে কীন ব্রীজের। ব্রীজের মেয়াদ উত্তীর্ন হওয়ায় কীন ব্রীজ দিয়ে এখন আর ভারী যানবাহন চলাচল করে না। বয়সের ভারে নূহ্য হয়ে পড়লেও পর্যটকদের কাছে কীন ব্রীজ আকর্ষনীয়। প্রতিদিনই কীন ব্রীজ দেখতে আসেন হাজার হাজার দর্শনার্থী।
ব্রীজটি খুব উঁচু হওয়ায় হালকা যানবাহন রিক্সা ভ্যান ব্রীজের উপরে উঠাতে চালককে খুব বেগ পেতে হয়। যানবাহন গুলোকে ঠেলে উপরে উঠাতে সহযোগিতা করেন কিছু শ্রমজীবী মানুষ। বিনিময়ে নেয় খুব সামান্য টাকা। কীন ব্রীজে ঠেলা পেশায় জড়িত শতাধিক বিভিন্ন বয়সের মানুষ। সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কীন ব্রীজে ঠেলাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। এমন অভিনব পেশা বাংলাদেশের আর কোথাও চোখে পড়ে না।
ঠেলাকে পেশা হিসেবে নিয়ে বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে বছরের পর বছর। অনেকেই আছেন যারা বংশ পরম্পরায় এ পেশায় নিয়োজিত। কীন ব্রীজে বাবা ঠেলেছেন এখন পুত্রও ঠেলছেন। এই পেশার বিভিন্ন লোকজনের অধিকাংশ বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন। রংপুর থেকে এসেছেন আব্দুল মালেক। তিনি তিন বছর ধরে এ পেশায় আছেন। তিনি জানান, দৈনিক তার আয় ২০০-৩০০ টাকা। সুনামগঞ্জের নয়ন (১৮) এক বছর ধরে এ কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘কাজের খোঁজে সিলেট এসেছিলাম। দুই-তিন দিন ঘুরে কাজ পাই নাই। রিকশা চালাতে গেলেও পরিচিত লোক লাগে। এখানে দেখলাম রিকশা ঠেললে পাঁচ টাকা করে পাওয়া যায়, তাই রিকশা ঠেলি।’
রংপুর থেকে এসেছেন সবুজ (৩০) , পাঁচ-ছয় বছর ধরে কীন ব্রীজে রিক্সা ঠেলেন। কীন ব্রীজেই রাতে ঘুমিয়ে পড়েন। তার আলাদা কোন ঠিকানা নেই। মইর উদ্দিন (৪০) রাজ মিস্ত্রি কাজের যোগালী। তিনি দিনে রাজ মিস্ত্রি কাজ করেন, পরিবারের বাড়তি খরচ মেটাতে রাতে রিক্সা ঠেলেন।
রিক্সা চালক আবদুল আলিম (৩০) বলেন, ওরা রিক্সা ঠেলায় আমাদের উপকার হচ্ছে, এত উচ্চু ব্রীজে কারও সহযোগিতা ছাড়া রিক্সা উপরে উঠানো খুব কষ্টকর।
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সালমান সাঁকো। তাঁর শৈশব কেটেছে কীন ব্রীজের পাশে দক্ষিন সুরমা এলাকায়। তিনি বলেন, ১২ বছর আগে মায়ের সাথে যখন বাজার করতে যেতাম, তখন কীন ব্রীজে ঠেলাদের দেখতাম। তাদের কেউ ফরমায়েশ করতো না, তারা নিজ থেকে এগিয়ে আসতো। তখন প্রতি রিক্সা ঠেলায় তাঁরা দুই টাকা পেতেন।
কীন ব্রীজ এলাকায় পাকিস্তান আমল থেকে পত্রিকা বিক্রি করেন হকার নুরুল ইসলাম। তিনি জানান, পাকিস্তান আমল থেকেই তিনি ঠেলাদের দেখছেন। কেউ কেউ ঠেলাদের পুল ঠেলা নামে ডাকেন।
এমন রীতি ব্রিটিশ আমল থেকেই চলে এসেছে। প্রথম দিকে প্রতি যানবাহন ঠেলার বিনিময় মূল্য ছিল দুই আনা, পরবর্তীতে আট আনা, একটাকা, দুইটাকা এবং বর্তমানে পাঁচ টাকা। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী কীন ব্রীজ অতিক্রম কালে দুইজন আরোহী হলে মূল ভাড়ার সাথে ঠেলা ভাড়া হিসেবে পরিশোধ করতে হবে ৫ টাকা। তবে মালামাল ব্যতীত যাত্রী একজন  হলে এটি প্রযোজ্য হবে না।
কীন ব্রীজের ঠেলাদের সম্পর্কে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী দীপংকর দাশ গুপ্ত বলেন, দলিত শ্রেনীর একটি অংশ কীন ব্রীজে রিক্সা ঠেলা পেশায় জড়িত। কাজের অভাবে তারা রিক্সা ঠেলছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ সার্জেন্ট মাজাহারুল আলম জানান, কীন ব্রীজে রিক্সা ঠেলা আজকের না, অনেকদিন ধরে চলে এসেছে। অনেকেই রিক্সা ঠেলেই সংসার চালান।

১১/১১/১৭
ছাইফুল ইসলাম মাছুম
শিক্ষার্থী স্টামপোর্ড ইউনিভার্সিটি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।