স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাওয়ার কাহন

This slideshow requires JavaScript.

ফার্মগেট অফিস থেকে কারওয়ান বাজার মোড় হয়ে হেঁটে বাসায় ফিরছিলাম। রাত তখন ১১টার কাছাকাছি হবে। কারওয়ান বাজার সিগনালের কাছে ৫-৬ জন ৮ থেকে ১০ বছরের শিশুকে দেখলাম রাস্তায় ফুল বিক্রি করছে । কারো কারো হাতে রঙ্গিন বেলুন।
গাড়ি সিগনালে থামলেই দৌড়ে গিয়ে গাড়ির জানালায় কেউ ফুল, কেউ বেলুন কেনার জন্য অনুরোধ করছে। এমন দৃশ্য প্রায় প্রতিদিনই চোখে পড়লেও , আজ ওদেরকে জানতে ইচ্ছে করছে। ওরা কারা? কোথায় থাকে? কোথা থেকে এসেছে? ওরা কী আমাদের সমাজেরই কেউ?
এই ছোট্ট বয়সেতো ওদের স্কুলে পড়াশোনার কথা ছিল। নিরাপদে মায়ের আঁঁচলের তলে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আজ ওরা রাস্তায় কেন?
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ওদের একজনের থেকে ফুল কেনার অজুহাতে আলাপ জমাতে শুরু করলাম।
ওর নাম রাশেদ। বয়স ১১ বছর, কালো চেহারায় এক অদ্ভুত মায়া। রাশেদের বাড়ি কিশোরগঞ্জ ভৈরব। বাবা বাসের ড্রাইভার ছিলেন, চার ভাই আর এক বোন নিয়ে ভালই কাটছিল সংসার। কিন্তু কয়েক বছর আগে বাবা মারা যায় হার্ড এট্যাকে। বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল বাবা বেঁচে থাকতে। বড় ভাই বিয়ে করে বাবার মৃত্যুর পর। তখন রাশেদ ঢাকার মালিবাগের এক মাদ্রাসায় পড়তো। ভাই বিয়ে করার পর পরিবারের আর কারো দায়িত্ব না নেওয়ায় রাশেদের মা গাজিপুরে বাসাবাড়িতে কাজ নেয়। রাশেদের সবচেয়ে ছোট ভাই মাজেদ তার সাথেই মাদ্রাসায় পড়তো। বাবা তাদের দ্ইু ভাইকে হাফেজ বানাতে চেয়েছিল।
সে মূহূর্তে মাদ্রাসায় এক হুজুর আসে, তার নাম মমিনুল হুজুর। যে কিনা রাশেদের বর্ণনা অনুযায়ী প্রচুর মারপিট করতো ছাত্রদের। একদিন রাশেদ আর রাশেদের ভাই বাড়িতে আসে আর ফেরা হয়নি মাদ্রাসায়। এখানেই ইতি ঘটে বাবার দুই ছেলের হাফেজ বানানোর স্বপ্ন। রাশেদ ১৪ পারা আর ছোট ভাই ৩ পারা মুখস্ত ছিল তখন।
এরপর মা দুই ভাইকে কাজে পাঠিয়ে দেয় তার দুর সম্পর্কের খালার সাথে ঢাকায়। তখন রাশেদের বয়স ৯ বছর আর ছোট ভাইয়ের ৭ বছর। এখন এক মহাজনের কাছে আছে, তার নাম ফাতেমা। রাশেদের ভাষায়, তাদের মহাজনের মত ভাল মানুষ বাংলাদেশে আর একটাও নাই।
রাশেদ আর মাজেদ দুই ভাই এখন মহাজনের কাছ থেকে বেলুন আর ফুল কিনে বিক্রি করে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বেলুন, আর বিকেল থেকে মাঝ রাত পর্যন্ত ফুল বিক্রি করে। জিজ্ঞেস করলাম, প্রতিদিন কয়টা ফুল আর কয়টা বেলুন বিক্রি হয়? একটু ভেবে জানালো প্রতিটা ফুলের মালা ৫টাাকা বিক্রি করলে তার ২ টাকা থাকে এভাবে দিন প্রায় ৬০ টি ফুলের মালা বিক্রি করে। আর দিন প্রায় ৫০টার মতো বেলুন বিক্রি করে। এতেও প্রতিটা বেলুনে তার ৫ টাকা লাভ থাকে। এতে সে দিনে মোট ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করে।
এই টাকার প্রায় সম্পূর্ণ অংশই মাকে পাঠায় বলে দাবি রাশেদের।
জানতে চাইলাম এখন জীবনের স্বপ্ন কী। কিছুই বলতে পারলো না। বরং মনে হলো লজ্জা পেল। এবার একই প্রশ্ন ঘুরিয়ে করলাম, কী করতে চাও বড় হয়ে? উত্তরে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলো রাশেদ। কিন্তু পেরে উঠলো না। শেষ পর্যন্ত বললো, ‘জানিনা, আল্লায় জানে…….
মহাজনে কইছে সামনের বছর স্কুলে ভর্তি কনরা দিবো। ক্লাস থ্রিতে, সুরভি স্কুলে, ঐ যে লাল জামা পরা কত পোলাপান স্কুলে যায়। আমার মহাজন খুব ভাল মানুষ। উনি কইছে স্কুলে ভর্তি কইরা আমারো লাল জামা বানায় দিবো।’
এভাবেই কথা শেষ হলো রাশেদের সাথে। এবার আমার বাড়ি ফেরার পালা। রাশেদের থেকে বিদায় নিয়ে হাটতে শুরু করলাম। মাথায় একটা ভাবনা চেপে বসলো, এই শহরের হাজারো শিশুর হয়তো একই ধরণের ভিন্ন ভিন্ন গল্প। লাল জামা পড়ে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। কজনের স্বপ্ন পুরণ হয়। জীবন হয়তো তাদের ঠেলে দেয় নতুন সংগ্রামে। যেখানে তাদের লাল জামার স্বপ্নও একদিন ফিকে হয়ে যায়।

Recent Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।