হায়দার আলীর সাতকাহন

হায়দার আলী চন্দ্রিমা উদ্যানের বেঞ্চে বসে আছেন। তিনি একটার পর একটা সিগারেট টানছেন। এই পর্যন্ত তিনি তিনটা সিগারেট আর দুইটা চা শেষ করেছেন।

হায়দার আলী আজ কয়দিন ধরে খুবই চিন্তার মধ্যে আছেন। সারাদিন একা একা রাস্তায় হাঁটা আর পার্কের ফাঁকা বেঞ্চে বসে থাকা ছাড়া, তার এখন তেমন কোন কাজ নাই।

তিনি দীর্ঘ নয়টা বছর সৌদি আরবে ছিলেন। দেশে আসেন প্রায় মাস দুয়েক হলো। অমানবিক পরিশ্রম, মানসিক কষ্ট আর চোখে স্বপ্ন নিয়ে তিনিএই নয়টা বছর বিদেশে পড়ে ছিলেন।

এখন স্বপ্ন সফল করার পালা।

হায়দার আলীর দুই মেয়ে, নাসরিন আর শিরীন। নাসরিন ক্লাস এইটে আর শিরীন ক্লাস নাইনে পড়ে। এক ছেলে সুমন। নয় বছর বয়স।

হায়দার আলীর স্ত্রী রুবানা আক্তার। তিনি ঘর সংসার আর ভাই বোন নিয়েই বেশী ব্যস্ত থাকেন। মাস খানেক হলো ছেলেটাকে নিয়ে তিনি বাপের বাড়ি চলে গেছেন। মেয়ে দুইটা ঘরে একা।

দেশে আসার পর থেকেই হায়দার আলীর স্ত্রীর সাথে সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছে না। প্রতিদিন দা কুমড়ো সম্পর্ক। দা কুমড়ো সম্পর্কের মূল কারণ টাকা।

হায়দার আলী সৌদি আরব থেকে তার স্ত্রীর নামে টাকা পাঠাতেন। এই নয় বছরে তিনি তিপ্পান্ন লাখ টাকা পাঠান। এই টাকার হিসাব নিকাশ নিয়েই রুবানা আক্তারের সাথে তাঁর দা কুমড়ো সম্পর্ক।

রুবানা আক্তার তার ইচ্ছা মতো টাকা খরচ করেন। যা হায়দার আলীকে কখনো বলেননি। বেশ কিছু মোটা টাকা ধার দেন তার ভাই বোনদের।

ভাইয়েরা রুবানা আক্তারের কাছে থেকে বিজনেসের নামে টাকা নিয়ে লস খান। কেউ রুবানা আক্তারের টাকা ফেরত দিতে পারেন না।

হায়দার আলীর তিপ্পান্ন লাখ টাকার মধ্যে হাতে পান মাত্র ছয় লাখ টাকা। বাকি টাকার আশায় ধরনা দেন রুবানা আক্তারের ভাই বোনদের কাছে।

ভাই বোনরা কেউই টাকা দিতে পারেন না। উল্টা রুবানা আক্তারের সাথে ঝগড়া ঝাঁটির বিষয় নিয়ে হায়দার আলীকে দু’কথা শুনিয়ে দেন।

হায়দার আলী এখন রুবানা আক্তারের ভাই বোনদের কাছে বিষ ফোঁড়া।তারা রুবানা আক্তার কে উল্টা পাল্টা সলা পরামর্শ দিয়ে মাথা নষ্ট করে ফেলেছেন। দা কুমড়ো সম্পর্কের আড়ালে রুবানা আক্তারকে ইন্ধন দেন তার ভাই বোনেরা, যা রুবানা আক্তার বুঝতে পারেন না।

রুবানা আক্তার স্ত্রী হিসাবে অত্যন্ত ভালো একজন মহিলা ছিলেন। অথচ এখন কেমন যেন পরিবর্তন হয়ে গেছেন।তিনি এখন নিজের স্ত্রী কে কেমন যেন অন্য রুপে দেখছেন। যা তিনি এতো বছরে কখনোই দেখেননি।

রুবানা আক্তার বুঝতে চাইছেন না যে, তার ভাই বোনেরা তার ভবিষ্যতের দিকে দেখছেন না। তাদের কাছে টাকাটাই এখন বড়। সারা জীবন কেউ তাকে ঘরে বসে খাওয়াবেন না।

তার এক ভাই সব সময় জটিল সব খারাপ বুদ্ধি দিয়ে তাকে চাপের মধ্যে রাখেন।

হায়দার আলীর এখন কিছুই ভালো লাগে না। কত স্বপ্ন ছিলো, দেশে এসে তিনি একটা দোকান দিবেন। অথচ সব হারিয়ে এখন তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

-হ্যালো,

-আসসালামুয়ালিকুম।

-অলাইকুমসালাম।

-আমি এডভোকেট শরিফুর রাহমান বলছি। আপনি কি হায়দার সাহেব?

-জি বলেন।

-আপনি কি একটু সময় করে আমার চেম্বারে আসতে পারবেন? আমার অফিস শান্তি নগর। বেইলি রোডের মাথায় কোনার বিল্ডিং টা।

-কিন্তু কেন? আমাকে কি বলবেন?

-আমি টেলিফোনে কিছু বলতে চাইছি না। যদি সময় করে আসতেন তো ভালো হতো।

-ঠিক আছে আমি আসছি।

হায়দার আলী এডভোকেটের চেম্বারে যান। এডভোকেট শরিফুর রাহমান হায়দার আলীর হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দেন।

-রুবানা আক্তারকে মানসিক নির্যাতন করার অপরাধে কারণ দর্শানো উকিল নোটিশ যা যুক্তিযুক্ত উপস্থাপন করে সাত দিনের মধ্যে জবাব দিতে হবে। অন্যথায় স্ত্রীকে মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতন করার অপরাধে আইনানুগ ব্যাবস্থা নেয়া হবে। সোজা কথায় ডিভোর্স লেটারের আগের নোটিশ ।

বাইরে মেঘের গর্জন, বিদ্যুৎ চমকানি আর প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়। হায়দার আলী উকিলের চেম্বার থেকে বেড়িয়ে বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটতে থাকেন। তার কাছে সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসে।

ঘরে ফিরেন রাত এগারটায়। লোড শেডিং চলছে। ঘরে বিদ্যুৎ নাই। নাসরিন শিরীন বাবার জন্য না খেয়ে বসে আছে। হায়দার আলী ঘরে ঢুকতেই তারা বাবার কাছে ছুটে আসে।

আব্বু। তুমি বৃষ্টিতে ভিজেছ? উউউফফফ আমি যদি ভিজতে পারতাম।

-তোর মায়ের সাথে কোন কথা হয়েছে মা?

-না আব্বু। তবে বিকালে ছোট মামা এসেছিল।

-আব্বু,

-কি মা?

-মামারা মানুষ ভালো না। কেমন করে যেন বাঁকা বাঁকা কথা বলে। তোমার উপর ওদের অনেক রাগ। তুমি বিদেশ থেকে আসার একমাস আগে থেকেই প্রতিদিন মামারা আর খালারা মায়ের সাথে এসে তোমাকে নিয়ে কথা বলতেন। টাকা নিয়ে কথা বলতেন। আমাদেরকে সামনে থেকে সরিয়ে দিতেন।

-আমি জানি মা। আচ্ছা মা, তোরা কি তোদের মায়ের কাছে যাবি?

-না আব্বু, আমারা অই বাড়ীতে যাবো না। মা আসলে আসুক না আসলে নাই, আমাদের প্রতি মায়া থাকলে তিনি আমাদের ফেলে এভাবে চলে যেতে পারতেন না।

মেয়েদের কথা শুনে হায়দার আলীর বুক ভরে যায়। রুবানা আক্তারের উকিল নোটিশের চিঠিটি তিনি বড় মেয়ের হাতে দেন।

এরপর থেকে প্রতিটি বিষয় তিনি মেয়েদের সাথে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেন। মেয়েদেরও বাবার প্রতি খুবই উদার ভালোবাসা।

আদালতে রুবানা আক্তারের সাথে হায়দার আলীর মামলা চলতে থাকে। ঘটনার পাঁচ মাস পর রুবানা আক্তারের সাথে হায়দার আলীর ডিভোর্স হয়ে যায়।

হায়দার আলী আবার নতুন করে সব কিছু ভাবতে শুরু করেন। প্রতিটা ভাবনায় নাসরিন শিরীন বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে বাবাকে সহযোগিতা করে।

ছোট ছেলে সুমনের জন্য হায়দার আলীর খুব কষ্ট হয়। তাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করে। মাঝে মাঝে স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে ছোট ছেলেকে আদর করে আসেন।

হায়দার আলী আর কোনো দিনই নতুন করে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখেন না।

তিনি আবার নতুন করে পরিশ্রম করতে থাকেন, শুধু মাত্র সন্তানদের মানুষের মত মানুষ করার জন্য।

এসব ঘটনার কয়েক বছর পর আমরা দেখতে পাই, রুবানা আক্তার একটি দৈনিক পত্রিকা অফিসে চাকরি করেন এবং কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে থাকেন।

ছোট ছেলে সুমন বাবার কাছে চলে আসে। বড় মেয়ে শিরীন তার প্রেমিক কে বিয়ে করে সংসার সাজান। ছোট মেয়ে নাসরিন কিছুই করে না। সে ঘরে থেকে ছোট ভাই সুমন এবং বাবাকে দেখাশুনা করেন।

হায়দার আলীর সাথে রুবানা আক্তারের আরও কোন দিনই কথা বা দেখা হয় না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।