রাজু বন নেহি জেন্টলম্যান

সর্বসাধারণ

শ্রীমঙ্গলের পাশেই বুড়বুড়িয়া চা বাগান । এ বাগানের চা শ্রমিক সিধু গোয়ালা । একসময় শ্রীমঙ্গলের নানা বাড়িতে গরুর দুধ বিক্রি করতেন । কিন্তু এমন একটা সময় এলো যখন কর্পোরেট কম্পোনীগুলো প্যাকেটজাত তরল দুধ বাজারজাত করল তখন লোকজন সিধুর কাছে থেকে দুধ নেওয়া বাদ দিল । সিধুর বাবা চাকরি করতেন চা শ্রমিক হিসেবে । চা-বাগানগুলোতে চা শ্রমিকের কাজ পাওয়া যায় উত্তরাধিকার ভিত্তিতে ।সিধুর বাবার পর সিধু চা শ্রমিক হিসেবে কাজে যোগ দিল । সেই সকাল বেলা ছয়টার সময়  চা-কারখানার সামনে গিয়ে লাইনে দাড়াতে হয় ।সেখানে টি-ম্যানেজার , টিলাসাহেব , কুলি সর্দার উপস্থিত থাকেন । টিলা সাহেব শ্রমিকদের নাম ধরে ডাকেন । অনেকটা স্কুলে ছাত্র উপস্থিতির হার যেভাবে জানেন টিচাররা । এরপর কুলি সর্দার চা-বাগানের কে কোন স্থানে কাজ করবে এলাকা ভাগ করে দেন । এলাকার নামও অদ্ভুত । সংখ্যানুযায়ী । আট নম্বর/ নয় নম্বর/ বারো নম্বর/ তেরো নম্বর । এরকম । ছয়টায় হাজিরা খাতায় নাম লেখিয়ে নির্দিষ্ঠ কুলি সর্দারের অধীনে কাজে বেরিয়ে পড়তে হয় । সারাদিন টুকরিতে কচি চা পাতা জমানো । বিকাল পাঁচটায় ফের হাজিরা দিয়ে কে কতোক্ষণ চা তুলল চা বাগান থেকে সেই হিসাব দেওয়া । এরপর টি-ম্যানেজার ওজন অনুযায়ী ডেকে ডেকে সবাইকে মজুরি দেন । সবচে বেশি মজুরি মাত্র চব্বিশ টাকা ।
এনিছেন  বা-বাগানের বরাদ্দকৃত খুপড়িতে ফিরতে হয় চা শ্রমিকদের । নারী চা-শ্রমিকরা খুপড়িতে ফিরে রাতের রান্না চড়ান মাটির চুলোয় । আর পুরুষ চা-শ্রমিকদের বেশিরভাগই  খুপড়িতে সস্তা বাংলা মদের দোকানে গিয়ে ভীড় জমান । সেই মদগুলো খুব সস্তা । নামও অদ্ভুত । যেমন ,”সেভেনটি” থার্টি” । এই দুটো মদ নাকি আসে সুদুর কুষ্টিয়ার দর্শনা থেকে । বাংলা মদেও লাইসেন্সধারী  আড়তদাররা এসব কিনে আনেন । পওে চা-বাগানের খুচরা বিক্রেতারা তাদেও কাছ থেকে সংগ্রহ কওে কুলিদের কাছে বিক্রি করেন । আবার অনেক চা শ্রমিক ভাত পচিয়ে কিসব গাছগাছড়ার ছালবাকল ,রস দিয়ে ঘরেই তৈরি করেন মদ । সেসবের নাম হাড়িয়া, চোনি ।
দ্দধু সিধু না সিধুর মতোন অনেকেই দিন শেষে যে টাকা পান তার সিংহভাগই ব্যয় করেন এসব মদ খেয়ে । ৫ টাকায়ও মদ পাওয়া যায় । সেসব মদের দোকানে আজকাল টিভি চালানো হয় । সেই টিভিতে বিপাশা বসু নাচে , প্রিয়াংকা চোপড়া সিগারেট টেনে ডিসকোবারে মদ খেয়ে চোখের ইশারায় ডাকে । সিধুরা মদমত্ত হয়ে দেখে । সারাদিনের পরিশ্রম ভুলে রাত হভীওে টলতে টলতে বাড়ি ফেরে । ভাগ্যিস চা-বাগান কর্তৃপক্ষ রেশনের নামে সস্তা আটা দেয় । না হলে না খেয়ে মরতে হতো ।
সিধুর কাছে  মনে হয় তাদেও জীবনটা যেন খুব ছক বাঁধা । বাগানেই কেটে যায় এক জীবন । সে তার বাপের কাছে শুনেছে তাদেও পূর্বপুরুষ নাকি একসময় ভারতের বিহারে বাস করতেন । ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন প্রথম অষ্টাদশ শতাব্দীতে এ দেশে চা-বাগানের গোড়াপত্তন করে তখন কাজের লোভ দেখিয়ে সিধুর পূর্বপুরুষদের নিয়ে আসে । সেসময়ই বৃটিশরা চা বাগানগুলোতে চা-শ্রমিকদেও সস্তায় মদ খাওয়া শেখায় বাংলা মদের দোকান বসিয়ে । কারণ ছিল যা রোজগার করবে তা মদাসক্ত হয়ে গেলে খরচ করতে বাধ্য হবে এবং পরের দিন আবার টাকার লোভে সকালে চা-কারখানার লাইনে এসে হাজিরা দিয়ে কাজে যাবে । তাদের বাচ্চাকাচ্চাদের স্কুলে পড়ানোর সামর্থ্য থাকবে না ।
এবং এভাবেই বংশপরম্পরায় তারা চা-শ্রমিক (কুলি ) হয়ে বেঁচে থাকবে ।
সিধুও এর ব্যতিক্রম নয় । সিধু বিয়ে করেছে । তার ছেলের নাম রাজু । শাহরুখ খান অভিনীত ”রাজু বন গ্যায়া জেন্টলম্যান ” মুভি দেখে ছেলের নাম খুব শখ কওে রেখেছিল রাজু । তার ¯^প্ন একদিন তার ছেলেও সেই মুভির রাজুর মতো জেন্টলম্যান হবে । রাতে মদ খেলে বউ উর্মিলার সাথে সেসব ¯^প্নের কথা বলে । কিন্তু সকাল হলেই দুজন গিয়ে চা-কারখানার লাইনে হাজিরা দিতে দাড়ায় । সেসময় তাদের রাজু ও রাজুর মতো অনেকে একটা বাড়িতে থাকে । সেই বাড়িতে থাকেন ষাটের কাছাকাছি বয়স্কা এক দাইমা । উনার নাম সরলাবালা । তিনি বাচ্চাদের দেখেশুনে রাখেন ( আধুনিক চাইল্ড কেয়ার সেন্টারের মতো নয় ) । কিন্তু টাকা নেন না । যে যা খাবার দেয় তা ই বাচ্চাদের খাওয়ান  সেই দাইমা সরলাবালা এত বাচ্চা সামলাবেনই বা কি করে ? এক সন্ধ্যায় সিধুর বউ উর্মিলা খুপড়িতে ফেরার আগে দাইমার বাড়িতে রাজুকে আনতে গেলে দেখে রাজুর ঠোঠ ফেটে রক্ত ঝরছে । খেলার সময় চোট পেয়েছে । বিকালে । বিকাল পাঁচটার পর চা-বাগানের ডিসপেনসারি বন্ধ হয়ে যায় । এমন এক সময় যে রাজুকে চিকিতসা করানোরও ব্যবস্থা নেই । যদি চিকিতসা করাতে হয় তবে শহওে যেতে হবে । এতটাকা তারা কোথায় পাবে ? সিধু সেদিন মদেও দোকানে যায়নি । উর্মিলা সিধুকে বলে , ” রাজুকু জেন্টলম্যান বানাবু , পারিবু ঠোঠের রক্ত থামাতি ? ( রাজুকে চেন্টলম্যান বানাবি , পারবি তার ঠোঠের রক্ত থামাতে ?) তারা এমন এক ভাষায় কথা বলে যেটি ওড়িয়া ও বাংলা ভাষার মিশ্রণ ।
সিধু চুপচাপ দাওয়ায় বসে থাকে । কোলে নিয়ে রাজুুকে শুয়ে উর্মিলা বিলাপ করতে থাকে । সেই রাতে আকাশে পূর্ণ চাঁদ ওঠে । চারিদিকে সবুজের সমাহারে চাঁদের আলো মানেই প্রতি দুর্গাপুজায় যে নাটঘরে দূর্গাপুজা হয় সেখানে দণ্ডনাচ ( একধরণের কোরাস লাঠি খেলা ) হয় । সেদিন ছেলে মেয়েরা একসাথে একটু হাড়িয়া খেয়ে গান গাইতে গাইতে বৃত্তাকারে নাচে ।
দুর থেকে ভেসে আসছে মাদলের শব্দ । লাঠির টকটক আওয়াজ । ওড়িয়া গান , ” বাটো ছাড়ো আজি করিব নাটো ।”
সিধুর মনটা উদাস হয়ে যায় । ওই রাতে রাজুর ভীষণ জ্বর । সারারাত ঘুমাতে পারে না
। উর্মিলার বিলাপ থামে না । পরদিন সকালে দুজনেই কাজে যায় না । রাজুকে নিয়ে ডিসপেনসারিতে যায় । ডিসপেনসারিতে অষুধ মানে প্যারাসিটামল, নাপা , ফিলমেট, এইসব । মানে জ্বর ও পেটে অসুখের । অবশ্য ডেটল ও তুলা থাকে । ডাক্তার ডেটল দিয়ে ঠোঠ ওয়াশ করে দেন । নাপা ট্যাবলেট দেন জ্বর কমানোর জন্য  ও ব্যাথা নাশের জন্য ।
সারাদিন উর্মিলা শুয়ে থাকে রাজুকে নিয়ে । সিধু রেডিও শোনে । গাজা খায় । সময় কাটে না । খাওয়া দাওয়া বলতে কিছুই করে না তারা । রাতে সিধু মুড়ি চানাচুর কিনে আনে । রাজুর জন্য বিসকিট।
কিন্তু এর পরদিনই রাজুর জ্বর বাড়তে থাকে । কোথায় পাবে টাকা ? কারণ যে মজুরি পায় তাতে তো টাকা জমানোর উপায় নেই ।
যত সময় যেতে থাকে রাজুর জ্বর বাড়তে থাকে । ওর মুখের দিকে তাকানো যায় না । অস্ফুস্ট স্বরে  বা-বা-বা-বা ডাকতে থাকে । উর্মিলার অসহায় চোখ। সেই রাতে ভোরের একটু আগে রাজু বমি করতে থাকে । বমির সাথে রক্ত বের হতে থাকে । বেশিক্ষণ না , মিনিট দশেক হবে । এরপরই রাজু ঢলে পড়ে সিধুর কোলে । নিথর হিম দেহ । সিধুর শরীর ঘামতে থাকে । কেননা সে ততক্ষণে বুঝে গিয়েছে রাজু আর বেঁচে নেই । উর্মিলার সারারাত খাটুনি গিয়েছিল রাজুর মাথায় গামছা ভিজিয়ে দিতে দিতে । সে ভোরের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল ।
সিধু’র সামনে শাহরুখ খান অভিনীত ” রাজু বন গ্যয়া জেন্টলম্যানের শাহরুখের নাচ ভাসতে থাকে । ছেলেন মরণ আর সে যেন চোখ খুলে শাহরুখ খানের নাচ দেখছে । তার সামনে ভাসতে থাকে বাবার মুখ । যে বাবা একদিন বলেছিল , ” কুলিগিরি করনিকে বলসিয়ে লে আলে ওড়িয়াসে । কুলি ক্যা জীবন রহে গ্যা ।এয়স্যে কাভি নেহি অষুধ কাভি নেহি কিতাব । যো রহিসছে ওহি শরাব । শরাব পিনে পিনে মর যাইকিরি জিন্দেগী ক্যা নাম হে কুলি । সমঝে ? ওই বিরিটিশ ওসলিয়ে শরাব পিনে শিখুইছি । ”( শ্রমিক বানানোর জন্য ওড়িসা থেকে নিয়ে এসেছিল আমাদের । শ্রমিকের জীবনই থাকবে । এর জন্য চিকিৎসা , পড়াশোনা না করানোর জন্য সস্তায় মদ খাওয়া শিখিয়েছে । সঞ্চয় নেই । আয় যেটুকু সে দিয়ে মদ খেয়ে মর । বুঝেছ ?
মানুষের মন বড়ই বিচিত্র । তার তল সে নিজেও জানে না । এরপর হয় কি, সিধু উর্মিলার পাশে মৃত রাজুকে শুইয়ে রেখে খুপড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে ।
হাটতে হাটতে পূর্বাশা আবাসিক এলাকার গলি পেরিয়ে রেলগেইট এলাকা পেরিয়ে মেঘনা পেট্রোল পাম্পের ডিপো পেরিয়ে রেল স্টেশনে এসে হাপাতে থাকে। তার খুব শ্বাস কষ্ট হয় । মনে হয় এ দুনিয়ায় তার কেউ কখনো ছিল না , থাকবে না । একটা লোকাল ঢাকাগামী ট্রেন এসে থামে তখন । তখন সূর্য উঠছে বালিশিরা ভ্যালির ওপাশ থেকে । টিকেট না কেটেই ট্রেনে ওঠে পড়ে সিধু ।
কোথায় যাবে সে ?
ট্রেন ছাড়তেই বিড়বিড় করে নিজের কাছে জানতে চায় । উত্তর নেই ।
উর্মিলা । বিড়বিড় করে সে ।
রাজু । বেডা আমার । বিড়বিড় করে সে ।
ট্রেন ছুটে চলেছে । দুপাশে ধানক্ষেত । স্টেশনের পর স্টেশন পেরিয়ে জংশন । কতো মানুষের ছুটোছুটি । ওই দুওে কতো সুন্দর দালান । কতো সুন্দর নারী-পুরুষরা । কতো সুন্দর সুন্দর জামা কাপড় তাদের ।
টিকেট চেকার টিকেট চেক করছে । সে ভয়ে নেমে পড়ে আখাউড়া জংশন স্টেশনে ।
সেই থেকে আখাউড়া রেল স্টেশনে ঠাই হয় সিধু গোয়ালার । সে যেন ওইদিন থেকে পুরো অতীত ভুলে গিয়েছে । রেলস্টেশনে রাজু বন গ্যয়া জেন্টলম্যানের শাহরুখ খানের নাচটি নেচে নেচে হাত পেতে ভিক্ষা চেয়ে বলে , ” রাজু বন নেহি জেন্টলম্যান ।”
সিধুর সাথে আমার পরিচয়  ওই রেল স্টেশনেই । তার কথা শুনি আর ভাবি যে জীবন দোয়েলের যে জীবন ফড়িঙ এর তার সাথে মানুষের হয়নাকো দেখা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।